
ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারের নীতির প্রতিবাদে গণবিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। দেশজুড়ে ধর্মঘট ও বিক্ষোভে বৃহস্পতিবার রাজপথে নেমেছেন প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ। দেশটির সরকারের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ গণবিক্ষোভ।
গত ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতার পর বৃহস্পতিবারও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রেন, নান্টেস, লিঁও ও মার্সেই শহরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। এসব ঘটনায় সারা দেশে ৪৪৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
বিক্ষোভের পাশাপাশি দেশজুড়ে চলা ধর্মঘটে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে ফ্রান্সের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও রেল যোগাযোগে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে। হাসপাতালের কার্যক্রমেও কিছুটা প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ডাকসেবা কর্মী, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান শ্রমিক ইউনিয়নগুলো এ ধর্মঘটের ডাক দেয়।
সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধর্মঘটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যালয়ের প্রায় ১৩ শতাংশ কর্মীও কর্মবিরতিতে অংশ নেন। তবে ইউনিয়নগুলোর দাবি, ধর্মঘটে অংশগ্রহণকারীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
রেলকর্মীদের কর্মবিরতির কারণে বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচলে ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয় দেখা দেয়। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের মাত্র ৫ শতাংশ কর্মী ধর্মঘটে অংশ নেওয়ায় স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেনি।
এবারের আন্দোলনে শিক্ষার্থী, বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং আট বছর আগে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা এক কাতারে শামিল হয়েছেন। প্রত্যেক পক্ষের দাবি আলাদা হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারের নিষ্ক্রিয়তা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাদের একই আন্দোলনে যুক্ত করেছে।
বৃহস্পতিবার লিঁও শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। রেন শহরে কয়েক ডজন বিশৃঙ্খলাকারী একটি হোটেলে ভাঙচুর চালায়। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদরত ইউনিয়ন সদস্যদের ওপরও হামলা চালানো হয়।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়াঁদ গেফ্রে জানিয়েছেন, তুলুজের কাছে একটি বিদ্যালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এটি পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, সারা দেশে অন্তত ৮৬টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাড়া দিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ বলেন, সহিংসতার বিভিন্ন চেষ্টা সত্ত্বেও পুলিশ সদস্যরা সাহস ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। নাগরিকেরা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরাপদে প্রতিবাদের অধিকার চর্চা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করেছে।
বেতন-পেনশন বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের দাবি
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক ইউনিয়নগুলো বেতন ও পেনশন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। ফ্রান্সের প্রভাবশালী ইউনিয়ন সিজিটি অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি তুলেছে। অন্যদিকে সিএফডিটি কর্মীদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১০০ ইউরো বা প্রায় ৭ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে।
শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবিও বেশ জোরালো। শিক্ষা খাতে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার আসন সৃষ্টির দাবি জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও তাঁর সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে এবং নতুন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে আন্দোলন
দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। আগামী বড়দিন, এমনকি আগামী বসন্তে অনুষ্ঠেয় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারীরাও ধারাবাহিক বিক্ষোভের কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন।
ফ্রান্সের এই গণবিক্ষোভের ঢেউ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও চলতি মাসের শেষ দিকে একই ধরনের বড় ধর্মঘটের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবরের সহিংসতার পর এবার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। রাস্তায় বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হলেও জনগণের দাবি মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ।
ফরাসি সাংবাদিক ও ইউটিউবার উগোদেক্রিপ্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ম্যাক্রোঁ বলেন, ছুটির পর সব হাইস্কুল খুলুক, সেটিই তিনি চান। তরুণদের ভবিষ্যতের সঙ্গে বিষয়টি জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের শ্রেণিকক্ষে ফিরে আসা প্রয়োজন। তরুণদের দাবিগুলো সরকার ইতোমধ্যে শুনেছে জানিয়ে তিনি বিক্ষোভ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি অন্তত হাইস্কুলগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানান।
সূত্র: সিএনএন

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত