
ডেস্ক রিপোর্ট | বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ ও ভালো স্কুল ভবনের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। কারও কবজি উড়ে গেছে, কেউ হারিয়েছেন চোখের দৃষ্টিশক্তি। পরিস্থিতি সামাল দিতে টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জের পাশাপাশি চলছে ধরপাকড়।
মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে আন্দোলনের সবচেয়ে বড় কর্মসূচিতে রাস্তায় নামেন প্রায় আড়াই লাখ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক। রাজধানী প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিওঁ, নান্তেস ও রেনসহ প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে বিভিন্ন স্থানে রায়ট পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। এতে কয়েকটি এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি হিসাবে, মঙ্গলবার প্রায় দুই লাখ মানুষ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। শুধু প্যারিসেই পদযাত্রা করেন প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, দেশজুড়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা চার লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে।
৫০০ গ্রেপ্তার, আহত ৪৩ পুলিশ সদস্য
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার প্রায় ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ৪৩ পুলিশ সদস্য।
আন্দোলন শুরুর পর দুই সপ্তাহের বেশি সময়ে প্রায় ছয় হাজার ১০০ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। বর্তমানে প্রায় এক হাজার ৮০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। এর মধ্যে এক হাজার ৫০০ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
আহত ২১৫ শিক্ষার্থী, ৮৫ শিক্ষক-স্কুলকর্মী
শিক্ষাঙ্গনে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় উদ্বেগ জানিয়েছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান ল্যকরনু। তিনি জানান, আন্দোলন শুরুর পর এ পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থী এবং ৮৫ জন স্কুলকর্মী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন।
তিনি ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে ভারী মাশুল হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এলিসি প্যালেসে মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ পুলিশের ভূমিকার সাফাই দিয়ে বলেছেন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই পুলিশের প্রতিক্রিয়া ছিল আনুপাতিক। তবে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ দাঙ্গায় রূপ নেওয়ায় পুলিশকে কঠোর হতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ক্ষোভ
ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো পুলিশের বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফরাসি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আনুপাতিকতাহীন দমনপীড়নের অভিযোগ তুলে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি ফ্রান্সের প্রধান আন সাভিনেল-বারাস বলেন, গত এক সপ্তাহে প্রকাশ্যে আসা ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে টিয়ারগ্যাস, লাঠি এবং কঠোর পুলিশি কৌশলের বিপজ্জনক ব্যবহারের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চাপের মুখে পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত বিভাগ ইতোমধ্যে ১০টি ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
কারও কবজি উড়ে গেছে, কেউ হারিয়েছেন চোখ
আন্দোলনের ভয়াবহতা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে কয়েকজন শিক্ষার্থীর গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায়।
উত্তর ফ্রান্সে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের হাতের কবজি বিস্ফোরণে উড়ে গেছে।
এর আগে বুধবার টুর্স শহরে ১৬ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মাথায় প্রতিরক্ষামূলক বিস্ফোরণ বলের আঘাত লাগে। এতে তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে যায়।
উত্তর-পশ্চিম প্যারিসে ১৪ বছর বয়সী আরেক কিশোরকে খুব কাছ থেকে পুলিশ গ্রেনেড সদৃশ অস্ত্র ছুড়লে তার বেশিরভাগ দাঁত ভেঙে যায়। গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার মুখমণ্ডলও।
অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার কপাল ও চোয়াল স্থির করা হয়েছে। বর্তমানে সে কথা বলতে পারছে না। স্ট্র দিয়ে তাকে তরল খাবার খেতে হচ্ছে।
‘আমাদের দাবি তো খুব সাধারণ’
মঙ্গলবার প্যারিসের প্লাস দে লা নেশন চত্বরে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী অ্যানা বলেন, তাদের দাবি খুবই সাধারণ—উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, পর্যাপ্ত শিক্ষক এবং ভালো স্কুল ভবন।
তার অভিযোগ, এসব দাবির বিপরীতে কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ছিল চরম বিপর্যয়কর ও সহিংসতায় ভরা।
মার্সেইয়ের শিক্ষার্থী ওশিয়ান জানান, বছরের পর বছর তিনি শিক্ষকবিহীন শ্রেণিকক্ষে বসেছেন। অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে কোনো যোগ্য বিকল্প শিক্ষকও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে অনেক শিক্ষকও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। রেন শহরের শিক্ষক রোমেন দুবার্গ বলেন, তারা পুলিশি বলপ্রয়োগের ঘটনা প্রত্যক্ষ করার পর আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে সহকর্মীদের নিয়ে রাজপথে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, বাড়ছে চাপ
ফ্রান্সে আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের মাত্র সাত মাস আগে এই আন্দোলন শুরু হওয়ায় ম্যাক্রোঁ সরকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে থাকা সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দল ‘লা ফ্রান্স ইনসোমিজ’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
তবে দলটি অহিংস আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত