
ডেস্ক রিপোর্ট | মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের প্রথম ধাপের তফসিল আগামী ১২ ডিসেম্বর ঘোষণা করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে কমিশন। আগামী ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়টি নিশ্চিত করে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ইউপি নির্বাচনের জন্য কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। এমনকি নভেম্বর মাসে নির্বাচন আয়োজনের জন্যও প্রস্তুতি ছিল। ফলে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
তফসিল ঘোষণার বিষয়ে তিনি জানান, ভোটগ্রহণের ৪০ দিন আগে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তারা কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করবেন। সে হিসাবে প্রথম ধাপের নির্বাচনের তফসিল ১২ ডিসেম্বর ঘোষণা হওয়ার কথা।
নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রথম ধাপে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই। তবে এ ধাপে সহিংসতা বেশি হলে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার।
ইসির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম ধাপের ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিতব্য এ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপ ২৯ এপ্রিল, চতুর্থ ধাপ ১৩ মে এবং পঞ্চম ধাপ ২৭ মে অনুষ্ঠিত হবে।
গত ১৩ অক্টোবর ইসির ১৩তম কমিশন সভা শেষে এ নির্বাচনী সময়সূচি ঘোষণা করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, দেশে আনুমানিক ৪ হাজার ৩০০টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৭ মের মধ্যে এসব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
ইউপি নির্বাচনে ৪৬ হাজার ৩৯৭ ভোটকেন্দ্র
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬ হাজার ৩৯৭টি ভোটকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের মধ্যে স্থায়ী ৪৫ হাজার ৯৭২টি এবং অস্থায়ী ৪২৫টি।
কেন্দ্রগুলোতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ভোটকক্ষ থাকবে ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৯টি। এ ছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য ৪১ হাজার ৪৬৬টি, পৌরসভা নির্বাচনের জন্য ৫ হাজার ২০২টি এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ৫ হাজার ১৫১টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে ইসি।
জেলা পরিষদ নির্বাচন সরাসরি ভোটে অনুষ্ঠিত না হওয়ায় এ নির্বাচনের জন্য আলাদা ভোটকেন্দ্র নির্ধারণের প্রয়োজন হয়নি।
ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখের বেশি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৬৭ জন।
নতুন আচরণবিধিতে কঠোর বিধিনিষেধ
২০১৬ সালের আচরণবিধি বাতিল করে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও জেলা পরিষদসহ সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধি জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।
নতুন আচরণবিধিতে মাইক ব্যবহারের সময় ও শব্দসীমা নির্ধারণ, নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, বিলবোর্ড ব্যবহারে সীমা নির্ধারণ এবং ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রচার, ভোটারদের প্রভাবিত করতে বলপ্রয়োগ ও অর্থ ব্যয়, প্রচারে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এবং নাগরিকের সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রচারসামগ্রী সাদা-কালো রাখার নির্দেশনাও রয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্রার্থীকে জরিমানা এবং প্রয়োজনে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনী সামগ্রী কেনাকাটাসহ অন্যান্য প্রস্তুতিও এগিয়ে নিচ্ছে কমিশন।
দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন, সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘ ১০ বছর পর দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। ফলে একটি রাজনৈতিক দল থেকে একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তবে দলগুলো যেকোনো একজন প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারে বলে জানিয়েছে। সে ক্ষেত্রে দলীয় সমর্থন পাওয়া প্রার্থীকে নিজ দল ও বিরোধী দলের অন্য প্রার্থীদের মোকাবিলা করতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে ইউপি নির্বাচনে পেশিশক্তির ব্যবহার ও সহিংসতার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে নির্বাচন কমিশন।
এ কারণে নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। এর ধারাবাহিকতায় আগামী ডিসেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসবে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনেক মানুষ মারা যান এবং সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এবার যাতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের হাঙ্গামায় না জড়ান, সে বিষয়ে আগামী মাসে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা চাওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কমিশনের বৈঠক হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের বৈঠক অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৫ হাজার ৪৯৭টি। এর মধ্যে ১৩টি সিটি করপোরেশন, ৩৩১টি পৌরসভা, ৬৪টি জেলা পরিষদ, ৫০৩টি উপজেলা পরিষদ এবং ৪ হাজার ৫৮৬টি ইউনিয়ন পরিষদ। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই বর্তমানে নির্বাচন উপযোগী হয়ে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং পৃথক প্রজ্ঞাপনে সব কাউন্সিলরকে অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরে ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদেরও অপসারণ করা হয়। এ ছাড়া ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ জনপ্রতিনিধিশূন্য হয়ে পড়ে।
ফলে দুই বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়াই চলছে দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত