
নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ পুনরায় চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ মাইগ্রেন্টস ফাউন্ডেশন (BMF)। তবে এবার যেন আগের মতো অতিরিক্ত খরচ, দালালচক্র ও সিন্ডিকেটের কবলে শ্রমিকদের পড়তে না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।
BMF বলছে, মালয়েশিয়ায় নতুন করে কর্মী পাঠানোর আগে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, ব্যয়-সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও অধিকারভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসে মালয়েশিয়া প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহী। প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মীকে শূন্য বা ন্যূনতম ব্যয়ে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান BOESL-এর মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনাকেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে BMF।
তবে সংগঠনটির মতে, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সাফল্য শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং কত খরচে কর্মী গেলেন, চাকরি ও বেতন নিশ্চিত ছিল কি না, কর্মপরিবেশ কেমন এবং সমস্যায় পড়লে প্রতিকার পেলেন কি না—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।
আগের অভিজ্ঞতা নিয়ে সতর্ক BMF
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে নতুন বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ রয়েছে। এর আগে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, প্রতিশ্রুত চাকরি না পাওয়া এবং শ্রমিক হয়রানি ও শোষণের নানা অভিযোগ সামনে এসেছিল।
এবার সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শুরু থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে BMF।
সংগঠনটির চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন জয় বলেন, “মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে হবে, কিন্তু অতীতের মতো শ্রমিকের পকেট খালি করে নয়; শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই।”
BMF-এর ১০ দফা দাবি
১. কর্মী নিয়োগের খরচ শূন্য বা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে এবং Employer Pays Principle বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. প্রথম ধাপে ১০ হাজার কর্মী শূন্য খরচে পাঠানোর উদ্যোগে কর্মী নির্বাচন, নিয়োগকর্তা, বেতন ও চাকরির শর্ত প্রকাশ করতে হবে।
৩. সরকারি অনুমোদনের আগে কর্মীর কাছ থেকে কোনো অর্থ নেওয়া বন্ধ করতে হবে এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. চাকরি নিশ্চিত না করে কোনো কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো যাবে না। বেতন, কাজের ধরন, কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম ও আবাসনসহ সব শর্ত লিখিতভাবে জানাতে হবে।
৫. নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ তৈরি হতে দেওয়া যাবে না।
৬. নিয়োগকর্তার প্রকৃত কর্মী চাহিদা, বৈধতা, বেতন দেওয়ার সক্ষমতা ও শ্রম অধিকার রেকর্ড যাচাই করতে হবে।
৭. বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন, অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা ও জরুরি আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. আগে প্রতারিত ও ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৯. নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে অভিবাসী অধিকার সংগঠন, শ্রমিক প্রতিনিধি, গবেষক ও নাগরিক সমাজকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
১০. শ্রমবাজার বারবার বন্ধ ও খোলার অনিশ্চয়তা দূর করতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও জবাবদিহিমূলক শ্রম অভিবাসন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
BMF মনে করে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালুর সাফল্য “কতজন কর্মী পাঠানো হলো” দিয়ে নয়, বরং “কতজন কর্মী নিরাপদ, ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছেন”—তা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
সংগঠনটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শ্রমবাজার পুনরায় চালুর আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি উন্মুক্ত জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে শ্রমিকবান্ধব নিয়োগ কাঠামো ঘোষণা করা হোক।
BMF-এর ভাষায়, বিদেশে কর্মসংস্থান হোক, কিন্তু প্রতারণা নয়। অভিবাসন হোক, কিন্তু ঋণের বোঝা নয়। নিয়োগ হোক, কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নয়। উন্নয়ন হোক, কিন্তু শ্রমিকের অধিকার বিসর্জন দিয়ে নয়।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত