
সফিউর রহমান সফিক | বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ঢাকা এল এ শাখার কানুনগো-সার্ভেয়ারদের অজানা অধ্যায় -৪
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা যেন অনিয়ম আর দুর্নীতির এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য। আর এই স্বর্গরাজ্যের অন্যতম এক নেপথ্য কারিগর হলেন সার্ভেয়ার শহিদুল ইসলাম। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত—দীর্ঘ প্রায় সাত বছর ধরে ঘুরেফিরে এলএ শাখার ১, ২, ৩, ৪ এবং ৫ নম্বর টেবিলে কর্মরত রয়েছেন এমন অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
এদিকে জানা গেছে ভূমি অধিগ্রহণের ফাইল আটকে রেখে ভূমি সেবা গ্রহীতাদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন (ঘুষ) আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে । এই সার্ভেয়ার এল এ শাখার ‘মধুর খনি’ থেকে অবৈধ আয়ের মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি এবং বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে রাজধানীর কচুক্ষেত ইব্রাহিমপুর এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন সার্ভেয়ার শহিদুল ইসলাম । অন্যদিকে তার বদলির প্রত্যাবর্তন নাটক ও রহস্যময় ঘেরা । কিছুদিন আগে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রেক্ষিতে শহিদুল ইসলামকে ঢাকা এল এ শাখা থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এল এ শাখার বিপুল অবৈধ আয়ের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি তিনি। অভিযোগ রয়েছে, গজারিয়ায় যোগদানের ছয় মাস পার হতে না হতেই মোটা অঙ্কের অর্থ (কয়েক লাখ টাকা) খরচ করে তদবিরের মাধ্যমে আবারও অলৌকিকভাবে ঢাকা এল এ শাখায় বদলির আদেশ করিয়ে নেন। বর্তমানে তিনি সার্ভেয়ারদের সবচেয়ে লোভনীয় স্থান হিসেবে পরিচিত ‘ঢাকা এল এ শাখা-২’-এ কর্মরত আছেন।
অনুসন্ধানে একাধিক সূত্রে আরো জানা গেছে অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের টাকা উঠাতে আসা লোকজনের ফাইল আটকে ১০-১৫% কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ ও অবকাঠামোর ভৌতিক বিল করে দালালদের সাথে আতাত করে হাতিয়ে নিয়েছেন এই সার্ভেয়ার কোটি কোটি টাকা । বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে ঢাকা জেলায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিগত সরকারের সময় জমি অধিগ্রহণের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের ক্ষতিপূরণের চেক দেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন সার্ভেয়ার শহিদুল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো ফাইলে খুঁত না থাকলেও ত্রুটি দেখিয়ে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখেন তিনি। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে দালাল বা সরাসরি তার সাথে যোগাযোগ করলে মোট টাকা ১০% থেকে ১৫% কমিশন দেওয়ার চুক্তিতে ফাইল ছাড় করাতে হতো। কোন কোন ক্ষেত্রে কমিশন ২৫ থেকে ৩০ পার্সেন্টও নিয়ে থাকেন উর্দু তোর কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে। এই কমিশন বাণিজ্যের কারণে শত শত প্রকৃত জমির মালিক তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত । বিগত ও বর্তমান দিনগুলোতে এবং হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত । নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ “ত’ আছেই । সাধারণ একজন সার্ভেয়ার হয়েও শহিদুল ইসলামের জীবনযাপন এবং স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ রূপ কথাকেও হার মানায়।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও এর আশপাশে তার একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক জমি রয়েছে। নিজের নাম ছাড়াও স্ত্রী, নিকটাত্মীয় ও বিশ্বস্ত সহযোগীদের নামে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকার এফডিআর (FDR) ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। সরকারি বেতন স্কেলের সাথে তার এই জীবনযাত্রার এবং অর্জিত সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নাম ভাঙিয়ে নানান অনিয়মের অভিযোগ পুরানো কাহিনী । এত অভিযোগ তার বিরুদ্ধে অথচ এখনো আছে ধরাছোঁয়ার বাহিরে । এই সার্ভেয়ার মোটা অংকের অর্থ খরচ করে দাপটে বদলি হয়ে পুনরায় ঢাকা এল এ শাখায় ফিরে আসার পর শহিদুল ইসলামের দাপট আরও বেড়ে গেছে। কার্যালয়ে তিনি প্রকাশ্যেই বলে বেড়ান যে, ওপরের মহলকে ‘ম্যানেজ’ করেই তিনি ফিরে এসেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তিনি সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সেবা গ্রহীতাদের ভয়ভীতি দেখান। ফলে তার এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কার্যালয়ের ভেতরেও কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না । এই বিষয়ে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বহাল তবিয়তে থাকা এই সার্ভেয়ারের খুঁটির জোর কোথায় ? তা নিয়ে খোদ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েই কানাঘুষা চলছে।
ঢাকা এল এ -২ শাখার সার্ভেয়ার শহীদুল ইসলাম এর নানান অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তাঁর মোবাইলে একাধিকবার ফোন করে ও হোয়াট’স অ্যাপে খুঁদেবার্তা পাঠিয়ে তারপর উত্তর পাওয়া যায়নি। ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ এবং সচেতন মহল মনে করেন, সার্ভেয়ার শহিদুল ইসলামের এই বিপুল অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকের) খোঁজ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন সচেতন মহল । এর সাথে তার নানান অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা জরুরি । একজন দুর্নীতিবাজ কর্মচারীর জন্য সরকারের পুরো ভূমি সেবা খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে না । আর কতদিন চলবে ঢাকা এল এ শাখার সার্ভেয়ারদের এহেন কর্মকান্ডের দৌরাত্ম্যে ?

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত