
ডেস্ক রিপোর্ট | শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক চাহিদা মেটাতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এতে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার মুখে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অংশীদারদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
সর্বশেষ জাপান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে রওনা হয়েছে মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন। দীর্ঘ প্রায় নয় মাস ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে প্রতিস্থাপন করতেই জর্জ ওয়াশিংটনকে পাঠানো হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জর্জ ওয়াশিংটন এশিয়া ছাড়ায় অঞ্চলটিতে আপাতত কোনো মার্কিন বিমানবাহী রণতরি থাকছে না। এমন সময়ে এ ঘটনা ঘটল, যখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীন নিজেদের নৌ ও কোস্টগার্ড তৎপরতা বাড়াচ্ছে।
দীর্ঘ মোতায়েনে চাপে মার্কিন নৌসেনারা
প্রায় নয় মাস টানা মোতায়েন থাকার কারণে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। খাদ্যসংকট, নষ্ট টয়লেট ও গোসলের ব্যবস্থার কারণে তৈরি হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এমনকি একজন নাবিক জাহাজ থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও খবর রয়েছে।
আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে জর্জ ওয়াশিংটন পাঠানো হলেও এর ফলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরির উপস্থিতি সাময়িকভাবে শূন্য হয়ে গেছে।
চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রতিরোধ কি দুর্বল হচ্ছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া বৃহত্তর সামরিক পুনর্বিন্যাসের অংশ। চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন থাকা থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কিছু অংশও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়।
এ ছাড়া দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াংয়ের মতে, এসব পদক্ষেপ চীনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এশিয়ায় আরও সক্রিয় চীন
যুক্তরাষ্ট্রের রণতরি এশিয়া ছাড়ার সময় চীনা নৌবাহিনীও প্রথম দ্বীপমালার বাইরে নিজেদের তৎপরতা বাড়াচ্ছে। চীনের লিয়াওনিং ও শানডং বিমানবাহী রণতরি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় রয়েছে।
ইয়াংয়ের মতে, গত জুন থেকে তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমায় চীনা কোস্টগার্ডের তৎপরতাও বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চীন শুধু তাইওয়ান, জাপান বা ফিলিপাইনকেই চাপ দিচ্ছে না; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ও সামরিক সক্ষমতাও যাচাই করছে।
চীনকে নিয়ে বাড়ছে মিত্রদের উদ্বেগ
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জা ইয়ান চং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার ফলে চীন আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে ওয়াশিংটনের মিত্রদের মধ্যে।
তবে তার মতে, রণতরি সরিয়ে নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার কিছুটা নমনীয়তা কমলেও এশিয়ায় এখনও বিপুল মার্কিন সেনা ও সামরিক সম্পদ রয়েছে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার সামরিক ও বেসামরিক কর্মী রয়েছে। এর বড় অংশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন।
প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো
ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা নিজেদের প্রতিরক্ষায় আরও বড় দায়িত্ব নিক। ২০২৬ সালের ন্যাশনাল ডিফেন্স স্ট্র্যাটেজিতেও মিত্রদের সঙ্গে দায়িত্ব ভাগাভাগির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তাইওয়ান ২০২৭ সালে প্রতিরক্ষা ব্যয় ১৮ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ফিলিপাইনও চীনের মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৪ শতাংশে উন্নীত করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়া থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা অঞ্চলটির দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে উৎসাহিত করতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এশিয়া ছাড়ছে না যুক্তরাষ্ট্র
তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরে যাচ্ছে—এমনটা মনে করছেন না অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ।
তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িকভাবে সামরিক সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হলেও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ফলে ইরান যুদ্ধের কারণে কিছু সামরিক সম্পদ সাময়িকভাবে সরিয়ে নেওয়াকে এশিয়া থেকে মার্কিন কৌশলগত প্রত্যাহারের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, একাধিক ফ্রন্টে মার্কিন সামরিক সম্পদ ব্যবহারের চাপও তত বাড়বে। এতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতার টানাপোড়েন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত