
ডেস্ক রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা বন্ধে তাদের ওপর প্রভাব খাটাতে ইরানকে সতর্ক করেছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঠেকাতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে নিরাপত্তা সমন্বয়ও জোরদার হচ্ছে।
সৌদি, পাকিস্তানি ও ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ইরানকে এই বার্তা দেওয়া হয়। সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ না নেয়, সে লক্ষ্যেই ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
মঙ্গলবার হুতিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত এলাকার একটি বিমানঘাঁটি এবং আশপাশের কয়েকটি শহরের তেল অবকাঠামোয় হামলা চালায়। এতে ৭৩ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবে এটি ছিল সবচেয়ে বড় হুতি হামলাগুলোর একটি।
এর পাল্টা জবাবে সৌদি আরব ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে হুতিরা।
হুতি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বুধবার জানান, গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার ‘জবাব ও শাস্তি দেওয়া হবে’ বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা
হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে তীব্র সংঘাত এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে, যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন দ্বিতীয় একটি যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও নতুন করে হুমকি সৃষ্টি করছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাও বেড়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বাড়ানোয় সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সতর্কবার্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। তুরস্কও এই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ। ফলে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা অব্যাহত থাকলে পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপরও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চাপ তৈরি হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ দেশটির একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেছেন, সৌদি আরবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হতে পারে।
তিনি বলেন, “একটি দেশের ওপর আগ্রাসনকে তিন দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।”
আসিফ আরও বলেন, “এ বিষয়ে কোনও অস্পষ্টতা বা সন্দেহ নেই। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে উসকানিবিহীন আগ্রাসন কিংবা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে এই চুক্তি অবশ্যই কার্যকর হবে।”
তবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কোনও সাড়া দেয়নি।
ইরানকে হুতিদের থামানোর আহ্বান
পাকিস্তানের এই হস্তক্ষেপের মধ্য দিয়ে সৌদি আরব ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার দীর্ঘদিনের নীতি অনুসরণ করেও ইসলামাবাদ যে পরিস্থিতিটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।
আঞ্চলিক এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ইরানের কাছে বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। এতে তেহরানকে হুতিদের ওপর নিজেদের প্রভাব ব্যবহার করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, মঙ্গলবার পাকিস্তান তাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেয়। তবে তেহরানের জবাব ছিল—‘ইরান হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।’
তবে দুই ইরানি সূত্রের দাবি, গত সপ্তাহেই তেহরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। হামলা চালানোর জন্য অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ইরান দিয়েছিল বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কয়েকজন কমান্ডার ইয়েমেনে গিয়ে হামলা সমন্বয়ে সহায়তা করেছেন বলেও তাদের দাবি।
তবে এসব দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আঞ্চলিক ওই কূটনীতিকের ভাষ্য, পাকিস্তান এখনও কূটনৈতিক উপায়েই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে। কারণ, সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছে যাক—যেখানে সৌদি আরব পাকিস্তানের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চাইতে বাধ্য হয়—ইসলামাবাদ তা চায় না।
তিনি বলেন, “সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি চুক্তি রয়েছে। তবে আমি আশা করছি পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাবে না, যেখানে পাকিস্তানকে বাস্তবে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে। আপাতত তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোবে।”
সৌদি আরবকে সহায়তায় পাকিস্তানের প্রস্তুতি
এরই মধ্যে সৌদি আরবের কর্মকর্তারা রিয়াদে পাকিস্তান ও তুরস্কের জ্যেষ্ঠ সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সূত্রটির দাবি, তিন দেশ একমত হয়েছে যে তাদের সেনারা ইয়েমেনে প্রবেশ করবে না। বরং যেকোনও প্রতিক্রিয়া সৌদি ভূখণ্ড থেকেই পরিচালিত হবে।
আরেক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের পাল্টা হামলায় পাকিস্তান সরাসরি যোগ দেবে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি।
ওই সূত্র স্পষ্ট করে বলেছে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক এবং সৌদি ভূখণ্ড সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রয়োজনে পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবের ভেতরে সামরিক, কারিগরি, স্থল বা আকাশ সহায়তা দিতে পারে। তবে অন্য কোনও দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় তারা অংশ নেবে না।
ইরানের চাপ উল্টো ফল দিতে পারে
আঞ্চলিক কূটনীতিকদের মতে, সৌদি আরবের ওপর ইরান ও হুতিদের চাপ প্রয়োগের কৌশল উল্টো তেহরানের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী অবরোধ ও চাপ কমাতে ওয়াশিংটনের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করাই যদি তেহরানের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় হামলা চালানোর ফলে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্কসহ যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ দেশগুলো আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতায় যুক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে বিভাজন তৈরির বদলে এই হামলা তাদের পারস্পরিক সামরিক সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ইরানের ওপর মার্কিন অবরোধ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত ট্রাম্পের
আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শিগগিরই তুলে নেওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
এক আঞ্চলিক কূটনীতিকের মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একই সময়ে কাতার নীরবে নতুন কিছু প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
আরেক আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের সামরিক প্রতিক্রিয়া আপাতত হুতিদের লক্ষ্য করেই সীমাবদ্ধ থাকবে; সরাসরি ইরানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা নেই।
রিয়াদের কর্মকর্তারাও মনে করছেন না যে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা তেহরানের মূল লক্ষ্য—ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার—অর্জনে সফল হবে।
ওই সূত্রের দাবি, সৌদি আরব ওয়াশিংটনের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেবে—এমন সম্ভাবনাও কম। কারণ ট্রাম্প মনে করছেন, অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখাই ইরানকে আলোচনায় বসানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্রটি বলেছে, “প্রশ্ন হলো, ইরান কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে এবং কতদিন তা সহ্য করতে পারবে। ট্রাম্প সামরিক সমাধান চান না। তিনি অবরোধের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ বাড়াতে চান।”
এদিকে সৌদি ভূখণ্ডে হুতিদের হামলা এবং ইয়েমেনে সৌদি পাল্টা হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চলতে থাকায় নতুন এই উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত