
ডেস্ক রিপোর্ট | সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

প্রতিকী ছবি
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন আর শুধু তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে জড়িয়ে পড়ছেন। ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) ব্যবস্থার মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় বছরে হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশে প্রায় ১ কোটি মানুষ অনলাইন জুয়ার প্রভাবে আক্রান্ত। কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ২০২৭ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ফলে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই এ ঝুঁকি দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জিইডির হিসাবে, বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার আনুমানিক ৬ কোটি ২০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। প্রতিবছর ৪ দশমিক ৭ থেকে ৬ দশমিক ১ শতাংশ হারে এ বাজার বাড়ছে। অবৈধ হলেও এমএফএসসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে এসব লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে। জুয়ার অর্থ স্থানান্তরে সহায়তা করছে—এমন ১ হাজারের বেশি এজেন্টের সন্ধান পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন জুয়ার আর্থিক চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অনলাইন বেটিং, জুয়া ও সংশ্লিষ্ট অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যাংক হিসাবগুলোতে ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা ডেবিট এবং ১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ক্রেডিট লেনদেন হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি লেনদেন করেছেন বেতনভোগী পেশাজীবীরা। তাঁদের হিসাবে ৬৪১ কোটি টাকা ডেবিট ও ৬৪২ কোটি টাকা ক্রেডিট হয়েছে। গৃহিণীদের হিসাবে ডেবিট হয়েছে ৩৭১ কোটি এবং ক্রেডিট ৩৪৭ কোটি টাকা। কৃষি ও মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের হিসাবে ২৩১ কোটি টাকা ডেবিট ও ২৩২ কোটি টাকা ক্রেডিট হয়েছে। শিক্ষার্থীদের হিসাবেও ১৯৪ কোটি টাকা ডেবিট এবং ১৭৫ কোটি টাকা ক্রেডিট লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
বিএফআইইউর পর্যবেক্ষণ বলছে, অনলাইন জুয়া এখন কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা অঞ্চলের সমস্যা নয়। চাকরিজীবী থেকে গৃহিণী, কৃষক থেকে শিক্ষার্থী—বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশ নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থ এসব কর্মকাণ্ডে ব্যয় করছেন। নিম্ন আয়ের মানুষও এতে জড়িয়ে পড়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তবে ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে গড়ে উঠছে বিস্তৃত সাইবার অপরাধের অবকাঠামো। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রতারণা, অর্থ পাচার, ভুয়া পরিচয় ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার অপব্যবহার।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিংয়ের একটি বড় আন্ডারগ্রাউন্ড মার্কেট সক্রিয়। প্রতারণার মাধ্যমে এমএফএসে আসা অর্থ স্থানীয় এজেন্টদের সহায়তায় দ্রুত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে নজরদারি থাকলেও এই ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বিদেশিদের অর্থ পাচারের সুযোগ তৈরি করছে।
এদিকে পুলিশের সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চক্রের কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশীতে একটি বহুতল ভবন থেকে চীন, পাকিস্তান, লাওস ও ভিয়েতনামের ৬২ নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ৭০টির বেশি ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে। এসব ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার পর তাঁদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
কক্সবাজারেও চীনা নাগরিকদের একটি সন্দেহজনক নেটওয়ার্কের সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ চীনা নাগরিক কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্ট ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিলেন। অভিযানে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চক্রটি অনলাইন প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল ক্যাসিনো, ভুয়া ট্রেডিং ওয়েবসাইট ও হ্যাকিংয়ের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
এ ছাড়া গত মে মাসে ঢাকার উত্তরা ও তুরাগে অভিযান চালিয়ে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন চীনা নাগরিক। এ সময় তিনটি ৬৪-পোর্টের জিএসএম/জিপিআরএস সিম-মডিউল মেশিন, একটি আট-পোর্ট ও একটি ২৫৬-পোর্টের মেশিন, ২৮০টি সিম কার্ড এবং ২০টি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ধারণা, এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে একসঙ্গে শত শত সিম সক্রিয় রেখে জুয়ার লেনদেন, প্রতারণা ও অন্যান্য অবৈধ আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছিল।
গত আগস্টে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় আরেক অভিযানে ৬ হাজারের বেশি সক্রিয় সিমকার্ড ও ২০টি গেটওয়ে ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে তিনজন ছিলেন চীনা নাগরিক। ভুয়া চাকরি ও অতিরিক্ত আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে পরিচালিত একটি অনলাইন জুয়া নেটওয়ার্কের সঙ্গে এ কার্যক্রমের যোগসূত্র ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সব মিলিয়ে অনলাইন জুয়ার বাজার এখন শুধু ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর পেছনে তৈরি হয়েছে সিমভিত্তিক প্রযুক্তি অবকাঠামো, ভুয়া পরিচয়, ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেল এবং আন্তদেশীয় অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা। ফলে অনলাইন জুয়া একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতি, প্রতারণা, সাইবার অপরাধ ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অনলাইন ক্যাসিনো ও জুয়া প্ল্যাটফর্মের বিস্তার নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে কম মূলধন ও সীমিত প্রযুক্তিগত দক্ষতা দিয়েও অনলাইন ক্যাসিনো পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বিদেশিদের এ ধরনের তৎপরতা প্রতিহত করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত অবৈধ বিদেশিদের আইনের আওতায় আনার বিকল্প নেই।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত