সর্বশেষ >>
সর্বশেষ >>
Advertise with us

সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকট ‘নীরব ঘাতক’ ব্যাটারিচালিত রিকশা

মফিজুর রহমান   |   শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৮৩ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকট ‘নীরব ঘাতক’ ব্যাটারিচালিত রিকশা

রাজধানী ঢাকার অলি-গলি ছাপিয়ে মূল সড়কগুলোতেও প্রতিনিয়ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। শুধু রাজধানীর সড়ক দখল করে আছে বৈধ নিবন্ধন বা রুট অনুমোদন বিহীন ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা। যানজটের পাশাপাশি এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিদ্যুৎব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অনুমোদনহীন ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচলকারী কয়েক লাখ অটোরিকশা শুধু যানজটই বাড়াচ্ছে না, বরং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলাচল, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং নির্ধারিত লেন না মানার কারণে নগরীর সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

রাজধানীতে ট্রাফিক সিগন্যাল মানার সুন্দর সংস্কৃতি সৃষ্টি হলেও তা মানছে না অটোরিকশাচালকরা। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে প্রায়ই দেখা যায় অটোরিকশাচালকরা ট্রাফিক সিগন্যাল উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাল বাতি জ্বলার পরও তারা রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে। এতে মোড়গুলোতে যানবাহনের চাপ বাড়ে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া যাত্রী পাওয়ার জন্য হঠাৎ থেমে যাওয়া কিংবা রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য যানবাহনের চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশের সড়কে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব যানবাহন চালাতে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে মোড়, সংযোগ সড়ক এবং প্রধান সড়কের প্রবেশমুখে এসব যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশের পেছনে ব্যাটারিচালিত রিকশা দায়ী। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অটোরিকশা চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।

মাত্র এক দশক আগেও প্যাডেলচালিত রিকশা ছিল ঢাকার অন্যতম প্রধান ও তুলনামূলক নিরাপদ বাহন। মানুষ নিশ্চিন্তে রিকশায় চড়তো। মূল সড়কেও তাদের আনাগোনা অতিরিক্ত পর্যায়ে ছিল না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। বর্তমানে ইলেকট্রিক থ্রি–হুইলার বা ব্যাটারিচালিত রিকশা নগর পরিবহনের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এটি তাদের কাজের একটি বড় অংশজুড়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করছে। এ রিকশাগুলো রাস্তার নিয়ম না মেনে প্রায়ই উল্টাপাল্টা বা ভুল পথে চলাচল করে, যা ট্রাফিক পুলিশের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাটারিচালিত রিকশার অপরিকল্পিত চলাচল নাগরিক জীবনকে নাজেহাল করতে শুরু করেছে। প্রায় ৭৩ শতাংশ গ্যারেজ সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে। এনজিও ও সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে কেনা হয়েছে ২৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা। চালকদের গড় দৈনিক আয় ১,০০০-১,৫০০ টাকা হলেও রিকশা ভাড়া, মেস ভাড়া, খাওয়া ও অন্যান্য খরচ বাদে প্রায় ৪০ শতাংশ চালকের নিট আয় ৫০০ টাকার নিচে। এক-চতুর্থাংশ চালক ঋণগ্রস্ত এবং ১১ শতাংশ ঋণ শোধে অক্ষম।

আবাসিক মিটার থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ৬৭ শতাংশ গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ করা হয় এবং ১৬ শতাংশ গ্যারেজ ঝুঁকিপূর্ণভাবে পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে, যা বিদ্যুৎ খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

রিকশায় প্রধানত দুই ধরনের ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে– লেড এসিড (৭৭ শতাংশ) এবং লিথিয়াম-আয়ন (২৩ শতাংশ)। লেড এসিড ব্যাটারির আয়ুষ্কাল ৬-১২ মাস হলেও পাঁচ মাস পরে কার্যকারিতা কমতে শুরু করে। নষ্ট ব্যাটারির প্রায় ২৩ শতাংশ যত্রতত্র ফেলা হয়, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া অন্যান্য যানবাহনের থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি।

ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে প্রধান ক্ষতি

সড়ক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে — ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে চলাচল ও বেপরোয়া চালনার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে — প্রধান সড়ক ও মোড়ে অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নগর পরিবহন ব্যবস্থার গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে — নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাটারি চার্জিং গ্রিডের ওপর অপ্রয়োজনীয় লোড সৃষ্টি করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে অবৈধ সংযোগ ব্যবহৃত হচ্ছে।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে — নিম্নমানের লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ও অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিসাসহ অন্যান্য দূষণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
কৃষি ও উৎপাদনশীল খাতে শ্রমিক সংকট তৈরি হচ্ছে — সহজ আয়ের আশায় অনেক শ্রমিক কৃষি ও অন্যান্য উৎপাদনমুখী খাত ছেড়ে এই পেশায় চলে আসছেন।
অবৈধ অর্থনৈতিক চক্র ও নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছে — অনিবন্ধিত যান, অবৈধ গ্যারেজ, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে অতিরিক্ত ৭টি নেতিবাচক প্রভাব

উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে — দীর্ঘ যানজটের কারণে প্রতিদিন লাখো মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দেয়।
জাতীয় অর্থনীতিতে পরোক্ষ ক্ষতি হচ্ছে — সময়ের অপচয়, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়, ব্যবসায়িক বিলম্ব এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ধীরগতির কারণে অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরোক্ষ ক্ষতি হচ্ছে।
মানুষের হাঁটার অভ্যাস কমে যাচ্ছে — অল্প দূরত্বেও ব্যাটারিচালিত বাহনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাচ্ছে।
স্থূলতা ও অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে — বিশেষ করে সারাদিন ডেস্কে কাজ করা মানুষের ক্ষেত্রে কম হাঁটা ও কম শারীরিক পরিশ্রমের কারণে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
পরিবার ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে — যাতায়াতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ায় পরিবারকে সময় দেওয়া, বিশ্রাম ও সামাজিক সম্পৃক্ততা কমে যাচ্ছে।

ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের কারণে আমাদের কৃষি খাতে শ্রমিকদের সংখ্যা কমছে। মাঠে ধান পড়ে থাকে। কাটার লোক পাওয়া যায় না। এভাবে প্রতিদিন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়তে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি নিয়ে ভেবে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের জন্য মহাদুর্ভোগ অপেক্ষা করছে। সর্বনাশা ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক বন্ধ করা হোক। রক্ষা করা হোক পরিবেশবান্ধব পায়ে টানা রিকশা। অমানবিক মনে হলেও আমার শ্রমঘন দেশের পায়ে টানা রিকশা অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সিসা দূষণ থেকে রক্ষা করবে, দেশ-সমাজ বাঁচবে নীরব ঘাতক এই ব্যাটারি রিকশা থেকে। তবে, প্রয়োজনে প্রতিবন্ধী চালকদের জন্য ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইজি বাইক ও মিশুক) ড্রাইভিং নীতিমালা প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের অনেকে ধারদেনা বা ঋণ নিয়ে তাদের বাহন কেনেন। আবার বাহনটি যখন সড়কে নামানো হয়, তখন অনেককে ম্যানেজ করে চলতে হয়। এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। নিরাপদ সড়ক ও ট্রাফিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে এ খাতের অব্যবস্থাপনা দূর করা প্রয়োজন। এ জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ করে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এ ধরনের যানবাহন। এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে। এসব যানবাহনের দৌরাত্ম্যে সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা ও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। এ যানবাহনগুলো ধীরগতির হলেও সড়কে চালকদের বেপরোয়া গতি মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা শহরের প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে এসব বাহনের অবাধ চলাচলে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়।

লেখক : বাজার বিশ্লেষক ও অর্থ ব্যবস্থাপনা পরামর্শক। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, গোল্ড বেল গ্রুপ।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আরও
Advertise with us

ফলো করুন Daily News of Bangladesh-এর খবর

প্রধান সম্পাদক
Cheif Editor

আমিনুল ইসলাম
Aminul Islam

সম্পাদক ও প্রকাশক
Editor & Publisher

সফিউর রহমান সফিক
Shafiur Rahma Shafiq

ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
Managing Editor

মোহাম্মদ ফিরোজ খান
Mohammed Feroz khan

ইউরোপ ব্যুরো চীফ
Europe Bureau Chief

Shah Mohammed Taifur Rahman Choton Tel.+393274953442 শাহ মোহাম্মদ তাইফুর রহমান ছোটন
ঠিকানা

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত