
ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন রোনান ও ডেকলান সুলিভান। জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাওয়ার পর এবার তাঁদের লক্ষ্য আরও বড়—বাংলাদেশকে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিয়ে যাওয়া। একই স্বপ্ন দেখছেন জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সুলিভান ভাইরা জানান, বাংলাদেশের হয়ে খেলার সুযোগ তাঁদের কাছে প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। তবে এই সুযোগ তাঁদের শুধু ফুটবলের সঙ্গে নয়, নিজেদের শিকড় ও বাংলাদেশের সংস্কৃতির সঙ্গেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করেছে।
সুলিভান ভাইদের বাংলাদেশ অধ্যায়ের শুরু ইনস্টাগ্রামের একটি বার্তা দিয়ে। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি সমর্থক পেজ তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সংশয়ে থাকলেও পরে তাঁরা জানতে পারেন, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করা বৈধ একটি প্ল্যাটফর্ম এটি।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মায়ের সূত্রে জাতীয় দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা পান রোনান ও ডেকলান। তবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁদের বেশ কিছু জটিলতার মুখে পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত গত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন তাঁরা। যোগ দেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ দলের ক্যাম্পে।
৩০ জনের বেশি খেলোয়াড়ের সেই ক্যাম্পে দলে জায়গা নিশ্চিত ছিল না তাঁদের। ছিল ভাষাগত বাধাও। রোনান জানান, বিদেশি হওয়ায় শুরুতে অনুশীলনে বল পাওয়াও কঠিন ছিল। তবে সুযোগ পেয়েই নিজেদের সামর্থ্য দেখান দুই ভাই। কয়েক দিনের মধ্যেই দলে জায়গা পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন তাঁরা।
এরপর মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামেন রোনান ও ডেকলান। ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল গোলশূন্য ড্র হওয়ার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। বাংলাদেশের হয়ে শেষ শট নিতে এগিয়ে যান রোনান। তাঁর নেওয়া পানেনকা শট জালে জড়াতেই শিরোপা নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের।
মালে স্টেডিয়ামে তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন হাজারো দর্শক। দেশে ফেরার পর সুলিভান ভাইদের দেওয়া হয় বীরোচিত সংবর্ধনা। ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় তাঁদের।
ডেকলানের কাছে বাংলাদেশের এই উন্মাদনা ছিল সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের যুব ফুটবলে এমন আবেগ খুব একটা দেখা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা তাঁদের দেশের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
সুলিভান পরিবারের ফুটবল প্রতিভার অবশ্য আরও উদাহরণ রয়েছে। তাঁদের দুই ভাই কুইন ও ক্যাভানও ফুটবলে পরিচিত নাম। দুজনই ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে খেলছেন। কুইন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়েছেন, আর ক্যাভানকে দেশটির অন্যতম সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে বিশ্বকাপের স্বপ্ন শুধু সুলিভান ভাইদের নয়। জাতীয় দলের প্রধান কোচ থমাস ডুলিও বাংলাদেশের ফুটবলে বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ডুলি অনূর্ধ্ব-২০ দলের সাফ শিরোপা জয়ের মাত্র সাত সপ্তাহ পর জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন।
ডুলির বিশ্বাস, ভালো খেলোয়াড়দের সঠিকভাবে কোচিং করানো এবং খেলা নিয়ে তাঁদের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আনতে পারলে দলের পারফরম্যান্সে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি সম্ভব। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশকে ১৫০-এর ঘরে নিয়ে যাওয়াও তাঁর কাছে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দেরও জাতীয় দলে যুক্ত করতে চান ডুলি। সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছেন ফুলহ্যাম একাডেমির ১৯ বছর বয়সী উইঙ্গার ফারহান ওয়াহিদ এবং ইংল্যান্ডের চতুর্থ স্তরের লিগে খেলা ২৫ বছর বয়সী লুই ওয়াটসন। দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে আছেন হামজা চৌধুরী ও কানাডায় জন্ম নেওয়া মিডফিল্ডার শামিত সোম।
গোলরক্ষক পজিশন নিয়েও কাজ করছেন ডুলি। বিদেশে খেলোয়াড় খুঁজতে গিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য বার্তা পেলেও বাজেটের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই শুধু পরিচিত নাম নয়, বাংলাদেশের ফুটবলে সত্যিকার অর্থে অবদান রাখতে পারবেন—এমন খেলোয়াড়কেই দলে নিতে চান তিনি।
ডুলির পরিকল্পনা অবশ্য শুধু বিদেশি বা প্রবাসী বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় দলের সাফল্যের সঙ্গে দর্শকের আগ্রহ, পৃষ্ঠপোষকতা ও বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। গড়ে উঠবে শক্তিশালী ফুটবল কাঠামো, বয়সভিত্তিক একাডেমি থেকে উঠে আসবে নতুন খেলোয়াড় এবং তারা জায়গা করে নেবে পেশাদার লিগে।
বাংলাদেশের পুরুষ ফুটবল দল ইতিহাসে মাত্র একবার এশিয়ান কাপে খেলেছে। বিশ্বকাপের মূল পর্বে এখনো জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে ডুলির মতে, বিশ্বকাপ বা এশিয়ান কাপে খেলা অসম্ভব কোনো স্বপ্ন নয়; এটি একটি প্রক্রিয়া। সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক কাজের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সুলিভান ভাইদের চোখেও এখন সেই বিশ্বকাপের স্বপ্ন। ডেকলানের বিশ্বাস, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা যোগ্য বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের একত্র করতে পারলে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আর ডুলির স্বপ্ন আরও বড়—বাংলাদেশের শিশুরা শুধু আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থক হয়ে থাকবে না, নিজেরাই ফুটবলার হবে। একদিন সেই বড় দলগুলোর বিপক্ষে মাঠে নামবে।
ডুলির ভাষায়, ‘আমরা চাই না শিশুরা আর্জেন্টিনার সমর্থক হোক। আমরা চাই তারা খেলোয়াড় হয়ে উঠুক, যাতে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিলের মতো দলের বিপক্ষে খেলতে পারে।’

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত