
ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বান ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনের তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ৩৯০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি। আকস্মিক বন্যায় কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে এসে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) নেপালের কর্মকর্তারা জানান, দেশটিতে অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তিব্বতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও অন্তত তিনজন।
নিখোঁজের তালিকায় শত শত বিদেশি
নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে নিখোঁজ ৯১০ জনের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিক রয়েছেন এই তালিকায়।
নিখোঁজদের মধ্যে ভারতের ১৭৭, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪, যুক্তরাজ্যের ৩৩ এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজ ১০০ জন চীনা নাগরিকও রয়েছেন।
অন্যদিকে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান
দুর্যোগের পর থেকেই নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে। তবে সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দুর্গত এলাকায় খাবার, ওষুধ, তাঁবু ও জরুরি সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নেপালে পাঁচ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার স্থানে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি বাড়ছে। হ্রদটি ভেঙে পড়লে নতুন করে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
হিমবাহ ধসেই কি বিপর্যয়ের শুরু?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের একটি অংশ ধসে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, শুরুতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড হওয়া কম্পনটি সম্ভবত হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছিল।
প্ল্যানেট ল্যাবসের প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও বরফ ও পাথরের ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে বিপুল ধ্বংসাবশেষসহ প্রবল স্রোত তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে।
আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে ধসে পড়া বাড়ি, পানিতে ডুবে থাকা গাড়ি এবং প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া সেতুর চিত্র দেখা গেছে।
বিপদে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকরাও
দুর্যোগের সময় তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর হ্রদে তীর্থযাত্রায় থাকা মানুষজনও বিপদের মধ্যে পড়েন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর কাছে পবিত্র এসব এলাকায় পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে।
এদিকে বন্যার পানি গান্ডাক নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকা থেকেও হাজারো মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নেপালের পাশে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়
ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘের বৈশ্বিক জরুরি তহবিল (সিইআরএফ) থেকে নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ভারতও তাঁবু, খাবার ও ওষুধ পাঠিয়েছে। হেলিকপ্টারে করে এসব সহায়তা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটের বিদুরের পরিস্থিতি দেখতে সড়কপথে রওনা হয়েছেন বলে তার কার্যালয় জানিয়েছে।
বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। নেপালের মতো দেশের একার পক্ষে এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন।
জলবায়ু ও জননীতি বিশেষজ্ঞ সুনীল আচার্যের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
সূত্র: আল জাজিরা, এপি নিউজ

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত