
সফিউর রহমান সফিক | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৪২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা,সার্ভেয়ার,কানুনগোদের দুর্নীতি-১
———————————————-
কাগজপত্রে অসঙ্গতি অতঃপর ১১% ঘুষ তড়িঘড়ি করে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ ও অবকাঠামো বিল বাবদ প্রায় ১০০ কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করেছেন ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এল এ -৩ (তিন) শাখার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ও তার দুই সহযোগী সার্ভেয়ার , কানুনগো । এদিকে জানা গেছে প্রকৃত জমির মালিক ওয়ারিশদের ক্ষতিপূরণের টাকা না দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগ একাধিক ভুক্তভোগীর। তবে এই বিপুল অংকের টাকা যাচাই-বাছাই ছাড়া রিলিজ করার কারিগর বিতর্কিত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হলেন সেই রেফাঈ আবিদ । যিনি কুমিল্লা ও ঢাকার মতিঝিলের সাবেক এসিল্যান্ড ছিলেন সম্প্রতি ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এল এ) শাখায় যোগ দেওয়া কর্মকর্তা সৈয়দ রেফাঈ আবিদের বিরুদ্ধে পুনরায় ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে একাধিক সূত্রে জানা গেছে দায়িত্ব নেওয়ার পর জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ ও বিভিন্ন অবকাঠামোর অর্থ একটি নির্দিষ্ট কমিশন ধার্যের মাধ্যমে সার্ভেয়ার-কানুনগোর যোগসাজশে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অঙ্কের টাকা ছাড়করণ এবং নির্ধারিত কমিশন বা ঘুষ নেওয়ার এই অভিযোগ নিয়ে ভূমি প্রশাসন ও ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের আগস্টের শেষের দিকে ও সেপ্টেম্বর এর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এই অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা ব্যবস্থা করেন তিনি । যার বিনিময়ে সৈয়দ রেফাঈ আবিদের নিজের পকেটে ঢুকিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। এদিকে জানা গেছে উল্লেখিত অংকের অর্থ ছাড় করাতে ১১ শতাংশ ঘুষ কমিশন নেন রেহাই আবিদ চক্র, এর মধ্য থেকে ২% ঘুষ কমিশন নেন রেফাঈ আবিদ বাকি ৯% পার্সেন্ট ঘুষ কমিশন যায় সংশ্লিষ্ট শাখার সার্ভেয়ার আর কানুনগোর পকেটে । গত দুই সপ্তাহ আগে যে সমস্ত ফাইল ছাড় করেছেন তার কয়েকটি ফাইল নাম্বার দেওয়া হল পর্যায়ক্রমে সব ফাইল এর তথ্য প্রকাশ করা হবে । এল এ কেইস নং -৮/ ২০২১-২০২২ । ৪/২০২২-২০ । ১৭ / ২০২৩-২০২৪ । ১৭ / ২০২৩-২০২৪ ।১৭/ ২০২৩-২০২৪ । ১৫/ ২০২৩-২০২৪ । ৮/ ২০২৩-২০২৪ এছাড়া সিদ্ধেশ্বরী মৌজার এল এ কেইস নং ০৩.১৫.১৭/২০২৩-২০২৪ । এল এ কেইস নং ০৩.১৫.১৭/২০২৩২০২৪ এল এ সিপি নং ০১৮ অ্যাওয়ার্ড নং ১০২৫০৩৬ । ০৩.১৫.১৭/২০২৩-২০২৪ এল এ সিপি নং -১৫ অ্যাওয়ার্ড নং-১০২৫০৩৫ ও ০৩.১৫.১৭/২০২৩-২০২৪ এল এ সিপি নং ১৬ অ্যাওয়ার্ড নং -১০২৫০৩৪
তদবিরের’ বদলি ৫ থেকে ৩ এ
অনুসন্ধানে বিভিন্ন সূত্র ও কার্যালয়ের
নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে প্রথমত সৈয়দ রেফাঈ আবিদকে এল এ শাখা-৫ এ নিয়োগ করা হয়েছিল। তবে যোগদানের মাত্র সাত দিনের মাথায় অদৃশ্য ক্ষমতার জোড়ে ও বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে তিনি এল এ শাখার ‘টাকার খনি’ হিসেবে পরিচিত এল এ শাখা-৩ এ নিজের বদলির আদেশ করিয়ে নেন বিশেষ কারিশমায় । গুরুত্বপূর্ণ এল এ -৩ শাখায় বসার পেছনে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে । এরসাথে স্বল্প সময়ে প্রায় শত কোটি টাকা ছাড় ও ঘুষের কমিশন অভিযোগ রয়েছে এই ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে । এই বিষয়ে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে । এখানেই শেষ নয় আবিদ এল এ শাখা-৫ এ যোগদান করে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তিনি নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অধিগ্রহণকৃত জমির ক্ষতিপূরণের প্রায় ২৫ কোটি টাকা তড়িঘড়ি করে ছাড় করেন। এর বিনিময়ে তিনি নেন ২% পার্সেন্ট টাকা। মোট পার্সেন্ট মানে ঘুষ আদায় করা হয় ১১% টাকা । এরপর গত ৪ সপ্তাহ আগে এল এ শাখা-৩ এর দায়িত্বভার গ্রহণের পরপরই মাত্র কয়েক দিনে প্রায় ৭৫ কোটি টাকার জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের ফাইল অনুমোদন করেন। অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি ফাইল ছাড়ার পেছনে সৈয়দ রেফাঈ আবিদ নির্দিষ্ট ২% হারে ঘুষের কমিশন আদায় করা হয়েছে অনুসন্ধানে এ তথ্য জানা গেছে ।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ,
কমিশন না দিলে জমির ন্যায্য পাওনা ও ক্ষতিপূরণের টাকা তুলতে বছরের পর বছর ঘুরতে হয়, প্রকৃত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করেন, আর কমিশন দিলে মুহূর্তেই ফাইল ছাড় হয়ে যায়।
অতীতের বিতর্কিত ব্যাকগ্রাউন্ড এটিই
এই কর্মকর্তার এটাই প্রথম বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নয়। এর আগে কুমিল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, খাস জমি বন্দোবস্তে অনিয়ম ও ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। পরবর্তীতে ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের এসিল্যান্ড থাকাকালীন সময়েও সেবার নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও দালাল চক্রের সিন্ডিকেটকে প্রশ্রয় দেওয়ারসহ ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগ উঠে তার বিরুদ্ধে । তার এহেন কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদপত্র একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয় ।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ ও প্রশাসনের নিরবতা ! মন্ত্রী- সচিবের নাম ব্যবহার করে হয়রানি
এদিকে ঢাকা এল এ শাখায় ক্ষতিপূরণ নিতে আসা একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “উচ্চ মহলে শক্ত লবিং থাকায় এই কর্মকর্তা কাউকেই পরোয়া করেন না। সে নিজকে প্রধানমন্ত্রী দপ্তরের লোক আবার কখনো জনৈক মন্ত্রীর ছেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতল এক কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মচারী কর্মকর্তাদের নানান ভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে হয়রানি সহ হুমকি ধমকি দিয়ে কথা বলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে ।
অন্যদিকে আরো জানা গেছে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে আসা বিভিন্ন লোকজন নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আবেদন করলেও তার টেবিলে ফাইল আটকে রাখার ঘোষণা দেন তার অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীদের ডেকে । এর সাথে নির্দেশনা দেন তার কথামতো ফাইল ছাড়ার ব্যবস্থা করতে। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে বিগত দিনগুলোতে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে যারা কর্মরত ছিলেন তারা কেউই ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড় করাতে জমির অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তদের কাছ থেকে কোন পার্সেন্ট নির্ধারণ করে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের কাছ থেকে কোন টাকা গ্রহণ করেনি বা এমন অভিযোগ ওঠার ঘটনা বিরল। আরো জানা গেছে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার তৎকালীন এল এ ও (LAO) তানজিলা আক্তার, সাদিয়া সুলতানা, আব্দুল হালিম প্রমুখরা যখন ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কর্মরত ছিলেন তখন ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড় করাতে কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
বর্তমান ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সৈয়দ রেফাঈ আবিদ যে হারে ক্ষতিপূরণের টাকার চেক ছাড় করাতে নির্ধারিত হারে পার্সেন্টে (টাকার অংক) দাবী করছেন তাতে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন ক্ষতিপূরণের টাকার চেক ছাড় করাতে আসা লোকজন । পূর্বের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার আমলে এই ঘুষ নামক কমিশন ধারাবাহিকতা ছিলনা এখন এটা নিয়মে পরিণত হয়েছে একাধিক ভুক্তভোগী থেকে এ তথ্য জানা গেছে। বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা ক্ষতিপূরণের চেক উত্তোলন করতে আসা লোকজনের বক্তব্যে জানা যায় পূর্বে তাদের বিভিন্ন অধিগ্রহণের জমির ক্ষতিপূরণের টাকা পূর্বের সময় গুলোতে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তারা ক্ষতিপূরণের চেক নিতে আসলে কোন টাকা-পয়সা তাদের কাছে দাবি করেননি অথচ বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নির্দিষ্ট হারে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছ থেকে একটি পার্সেন্ট টাকা দাবি করেন সার্ভেয়ার ,কানুনগো এবং তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে একপ্রকার জোরপূর্বক তাদের ধার্য করা পার্সেন্ট আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ভুক্তভোগীরা। এক কথায় যাকে চাঁদাবাজির সাথে তুলনা করা যায় বলে ভুক্তভোগীদের এমন অভিমত ।
আরো জানা গেছে এল এ -৩ শাখার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সম্পর্কে ৩৮ বিসিএস ক্যাডারের জনৈক কর্মকর্তা জানান সৈয়দ রেফাঈ আবিদ এর বাবা ছিলেন একজন্য সরকারি কর্মকর্তা এবং আওয়ামীলীগ পরিবারের লোক । সৈয়দ রেফাঈ আবিদ সরকারি চাকুরির সুবাদে নানান অনিয়ম দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এই নিয়ে এই পরিবারের বিরুদ্ধে রয়েছে নানান অভিযোগ । সরকারি কর্মচারী মহলে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত আবিদ ৫ ই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর সহকারী কমিশনার সৈয়দ রেফাঈ আবিদ রং বদলে ফেলেন । তিনি একজন বিএনপিপন্থী এই তকমা দিয়ে বিভিন্ন মহলে নিজেকে জাহির করতে শুরু করেন। তবে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর এলাকায় অনুসন্ধান কালে জানা গেছে রেফাঈ আবিদের পুরো পরিবারই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বহু দিন আগে থেকে। এই আওয়ামী লেসপেন্সার বর্তমানে সরকারের ভিতরে ঢুকে প্রশাসনিক পদে থেকে বিভিন্ন অনিয়ম ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অপকর্মের লিপ্ত রয়েছে যার ধারাবাহিকতার অংশ হলো এল এ শাখার ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ছাড় করার নামে দুর্নীতি ও নানান অনিয়ম অপকর্ম ।
তার এই দুর্নীতির নিজের দায় অন্যদের ঘাড়ে চাপাতে অতি সুক্ষভাবে করেই চলছে দুর্নীতি সহ নানান অনিয়ম কর্মকান্ড ঢাকা এল এ শাখায় । এদিকে ঢাকা এল এ শাখার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সৈয়দ রেফাঈ আবিদের বিরুদ্ধে উঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে ফোন দিলে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। ঢাকা এল এ শাখায় যোগদানের পর দুই সপ্তাহে প্রায় শত কোটি টাকা ছাড়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন যা করা হয়েছে নিয়ম মেনে করা হয়েছে ১১% ঘুষের বিষয়টি তিনি অবগত নন বলে জানান । এদিকে ঘুষ ছাড়া এল এ শাখা-৩ থেকে কোনো চেক ইস্যু করা বর্তমানে অসম্ভব হয়ে পরেছে।”একজন কর্মকর্তার এমন লাগামহীন দুর্নীতির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কঠোর নজরদারি এবং তদন্তের দাবি জানিয়েছে সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহল।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত