
ডেস্ক রিপোর্ট | সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৬ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ডায়াবেটিস না থাকলেও বিভিন্ন কারণে সাময়িকভাবে রক্তে শর্করা বা ব্লাড সুগারের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। খাবার, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ কিংবা অসুস্থতার কারণেও এমনটা হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করা কতটা বেড়েছে, কতক্ষণ বেশি থাকছে, কত ঘন ঘন এমন হচ্ছে এবং পরে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তাই একবার রক্তে শর্করা বেশি পাওয়া গেলেই ডায়াবেটিস হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
খাবারের পর কেন বাড়ে রক্তে শর্করা?
কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খাওয়ার পর পরিপাকতন্ত্র সেগুলো ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত করে। এই গ্লুকোজ রক্তে প্রবেশ করায় স্বাভাবিকভাবেই রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ে। তখন অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নিঃসৃত হয়, যা রক্তের গ্লুকোজকে পেশি ও শরীরের অন্যান্য কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে।
সাদা ভাত, আলু, মিষ্টি পানীয় বা মিষ্টিজাতীয় খাবার তুলনামূলক দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে শাকসবজি, প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং উচ্চমাত্রার আঁশযুক্ত কার্বোহাইড্রেট খেলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়ার গতি তুলনামূলক কম হতে পারে। এ ক্ষেত্রে খাবারের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিস নেই এমন বেশির ভাগ মানুষের শরীরে ইনসুলিন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রক্তে গ্লুকোজকে স্বাভাবিক মাত্রার কাছাকাছি নিয়ে আসে। তাই খাবারের পর সাময়িকভাবে রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়া সবসময় কোনো রোগের লক্ষণ নয়।
মানসিক চাপেও বাড়তে পারে সুগার
তীব্র মানসিক চাপের সময়ও রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে। চাপের মধ্যে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন নিঃসৃত হয়। এসব হরমোন যকৃতকে সঞ্চিত গ্লুকোজ রক্তে ছাড়ার সংকেত দেয়। ফলে সাময়িকভাবে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে।
অসুস্থতার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। সংক্রমণ, জ্বর বা শারীরিক আঘাতের সময় স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়ে এবং কিছু সময়ের জন্য ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
ঘুমের ঘাটতিও একটি কারণ
পর্যাপ্ত ঘুম না হলেও রক্তে শর্করার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ঘুমের ঘাটতি শরীরের ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনতে পারে। নিয়মিত কয়েক ঘণ্টার কম ঘুমানোর পাশাপাশি রক্তে শর্করার মাত্রাও বেশি দেখা গেলে দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ব্যায়ামে কখনো কমে, কখনো বাড়ে
সাধারণত হাঁটা, দৌড়ানো বা অ্যারোবিক ব্যায়াম পেশিকে গ্লুকোজ ব্যবহারে সহায়তা করে এবং রক্তে শর্করা কমাতে পারে। তবে অত্যন্ত তীব্র ব্যায়ামের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে রক্তে শর্করা বেড়েও যেতে পারে।
কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের সময় অ্যাড্রেনালিনসহ কিছু হরমোন যকৃতকে অতিরিক্ত গ্লুকোজ রক্তে ছাড়তে উদ্দীপিত করে। ফলে কঠিন ব্যায়ামের পর কিছু সময়ের জন্য রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যায়াম এড়িয়ে চলতে হবে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম দীর্ঘমেয়াদে ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে এবং শরীরকে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে আরও সক্ষম করতে সাহায্য করে।
কিছু ওষুধেও বাড়তে পারে গ্লুকোজ
কিছু ওষুধ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে। এর মধ্যে কর্টিকোস্টেরয়েড, যেমন প্রেডনিসোলোন উল্লেখযোগ্য। কিছু হরমোনাল ও অন্যান্য ওষুধও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর যদি বারবার রক্তে শর্করা বেশি পাওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত। নিজের সিদ্ধান্তে কোনো ওষুধ বন্ধ করা ঠিক নয়।
খাবারের ধরন ও পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ
ডায়াবেটিস না থাকলেও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খেলে রক্তে শর্করা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। যেমন মিষ্টি চা, সাদা পাউরুটি ও জ্যাম দিয়ে তৈরি নাশতায় দ্রুত শোষিত কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকতে পারে। ফলে রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ডিম, শাকসবজি ও পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবারে প্রোটিন ও আঁশ বেশি থাকায় গ্লুকোজ তুলনামূলক ধীরে রক্তে প্রবেশ করে। তাই কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, বেশি আঁশযুক্ত খাবার নির্বাচন এবং কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়া রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়ার প্রবণতা কমাতে পারে।
কখন বেশি রক্তে শর্করাকে গুরুত্ব দেবেন?
একবার রক্তে শর্করা বেশি পাওয়া গেলে তা দিয়ে পরিস্থিতি বোঝা কঠিন। বাড়িতে ব্যবহৃত গ্লুকোমিটারেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি কখন পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটিও ফলাফল ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বারবার রক্তে শর্করা বেশি পাওয়া গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা ঝাপসা দেখার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রয়োজনে চিকিৎসক ফাস্টিং ব্লাড গ্লুকোজ, ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট বা এইচবিএ১সি পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। এর মধ্যে এইচবিএ১সি সাধারণত গত দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার একটি ধারণা দেয়। ফলে খাবারের পর একবারের রক্তে শর্করার মাত্রার চেয়ে এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর হতে পারে।
ডায়াবেটিসের আগে হতে পারে প্রিডায়াবেটিস
বারবার রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে শরীরের ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যাওয়া। এ অবস্থাকে প্রিডায়াবেটিস বলা হয়। এ পর্যায়ে অনেকের কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
তাই পেটে অতিরিক্ত মেদ, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরলের অস্বাভাবিক মাত্রা বা গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রক্তে শর্করার একটি সাময়িক বৃদ্ধি নিজে কোনো রোগের নিশ্চিত প্রমাণ নয়। ভারী খাবার, তীব্র ব্যায়াম বা মানসিক চাপের পর মাঝে মধ্যে সুগার বাড়তে পারে। কিন্তু কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই যদি বারবার রক্তে শর্করা বেশি থাকে বা এর সঙ্গে শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করানো উচিত।
রক্তে শর্করার মাত্রা পর্যবেক্ষণ করলে কখন পরীক্ষা করা হয়েছে, কী খাবার খাওয়া হয়েছে, কতটা শারীরিক পরিশ্রম হয়েছে এবং তখন অসুস্থতা বা মানসিক চাপ ছিল কি না—এসব তথ্যও লিখে রাখা যেতে পারে। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের এমন তথ্য চিকিৎসকের কাছে একবারের কোনো একটি রিডিংয়ের চেয়ে পরিস্থিতি বোঝাতে বেশি সহায়ক হতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত