
ডেস্ক রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৮ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সিরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সরকারের সঙ্গে হওয়া চুক্তির আওতায় সিরীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়েছে বাহিনীটি।
দামেস্কের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে এসডিএফের প্রধান মাজলুম আবদি জানান, এখন থেকে স্বাধীন কোনো বাহিনী হিসেবে এসডিএফের কার্যক্রম থাকবে না। তিনি এ সিদ্ধান্তকে সিরিয়ার জন্য ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, যুদ্ধের পর দেশটি এখন শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠনের পথে এগোতে চায়।
উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় একসময় বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল কুর্দি নেতৃত্বাধীন এসডিএফের হাতে। তবে গত জানুয়ারিতে সরকারি বাহিনীর অভিযানে তারা বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারায়। এরপর দামেস্ক সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছে বাহিনীটিকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত হয়। চুক্তিতে কুর্দিদের সাংস্কৃতিক, নাগরিক ও শিক্ষার অধিকার স্বীকৃতির কথাও রয়েছে।
সাত মাসের টানাপোড়েনের পর একীভূতকরণ
আইএসবিরোধী যুদ্ধে এসডিএফ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়। আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর ওয়াশিংটনের সঙ্গে দামেস্কের সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করে। এতে এসডিএফের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়।
আল-জাজিরার প্রতিবেদক হেইডি পেটের মতে, এসডিএফ বিলুপ্তির ঘটনা সিরিয়ার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে এসডিএফের ভারী অস্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং ওয়াইপিজির নারী যোদ্ধাদের কীভাবে সিরীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে—এসব প্রশ্নের কারণে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি সাত মাসের বেশি সময় ধরে ঝুলে ছিল।
ওয়াইপিজি চেয়েছিল তাদের সদস্যদের পেশাদার সেনাসদস্য হিসেবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া হোক। অন্যদিকে দামেস্ক তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এই মতপার্থক্যই চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
কুর্দিদের অধিকার কতটা নিশ্চিত হবে?
আসাদ পরিবারের প্রায় পাঁচ দশকের শাসনামলে সিরিয়ার কুর্দিরা নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন নাগরিকত্ব থেকেও বঞ্চিত ছিল। নতুন চুক্তিতে কুর্দিদের সাংস্কৃতিক ও নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি তাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
মাজলুম আবদি জানিয়েছেন, কুর্দি ভাষায় শিক্ষার অধিকারও সরকার স্বীকার করেছে। চলতি বছর থেকেই কুর্দি ভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, অধিকার স্বীকৃতির প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দিদের প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলেও মন্তব্য করেছেন সিরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অধ্যাপক ও লেখক সালেহ মুবারক।
একক সিরিয়া গঠনের পথে বড় পদক্ষেপ
সালেহ মুবারকের মতে, এসডিএফের বিলুপ্তি সিরিয়াকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পথকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। সিরিয়ার ধর্ম, সম্প্রদায়, ভাষা ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগও এতে তৈরি হবে বলে মনে করেন তিনি।
তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চুক্তিটি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এসডিএফের সদস্যদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা, অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাঠামো—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার এক দিন পর এসডিএফ বিলুপ্তির ঘোষণা আসে। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পর ওয়াশিংটন ও দামেস্কের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারাও এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সিরিয়া একটি অন্ধকার অধ্যায় পেছনে ফেলে এখন উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও নতুন করে দেশ গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: আলজাজিরা

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত