
ডেস্ক রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ইরানের বিলবোর্ডে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় জয়ের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত। প্রশ্ন উঠেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করবেন, নাকি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর কংগ্রেসের চাপের মুখে যুদ্ধের পরিকল্পনা থেকে সরে আসবেন?
নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযানের আশঙ্কায় অঞ্চলটি থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। আরব বিশ্বের নেতারাও সম্ভাব্য ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে হামলার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর দলটির অভ্যন্তরেই ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলপন্থি নীতিকে দায়ী করা হচ্ছে। ভোটের পরদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধ এবং এর প্রভাবে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সরাসরি এই যুদ্ধকে পরাজয়ের জন্য দায়ী করেছেন। তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ পুত্র ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শুরু থেকেই ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করে আসছেন তিনি।
নির্বাচনের পর জ্বালানি তেলের বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। তেলের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট ফেলো ও আমেনা স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান নির্বাহী মেরিসা খুরমা মিডল ইস্ট আইকে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ উপদেষ্টা ও কংগ্রেসের চাপ বাড়াতে পারে। এর ফলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা থেকে বিরত থাকতে পারেন তিনি।
খুরমার মতে, পরিস্থিতি নির্ভর করছে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের সদস্যরা কীভাবে একযোগে যুদ্ধের নীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টারা তাঁকে কী পরামর্শ দেন, তার ওপর।
তবে কংগ্রেসের বাধা ট্রাম্প কতটা গুরুত্ব দেবেন, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের ভেটো ক্ষমতা নিয়ে বরাবরই গর্ব করে এসেছেন তিনি। যদিও দুই বছর শুধু ভেটো দিয়ে কাটাতে চান না বলে জানিয়েছেন, তবে বর্তমান মেয়াদই তাঁর শেষ হওয়ায় আইনপ্রণেতাদের চাপ উপেক্ষা করার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। তবে ২০০১ ও ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ের পর থেকে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কংগ্রেসের নতুন করে চূড়ান্ত অনুমোদন নেননি।
এদিকে, ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও আইনি চাপ তৈরির সুযোগ বাড়িয়েছে। সিনেটে ৫৪টি এবং প্রতিনিধি পরিষদে ২৩৭টি আসন নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই অবস্থান কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের বিষয়ে তদন্ত এবং প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে দলটি।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার জানিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে যুদ্ধ বন্ধ করা। তিনি বলেন, ‘আমরা এই যুদ্ধ শেষ করতে যাচ্ছি। আমাদের সঙ্গে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান সদস্যও যোগ দিয়েছেন।’ তাঁর ভাষ্য, মার্কিন জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ চালিয়ে গেলে সংবিধান অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা ব্যবহার করে তা প্রতিহত করতে পারে কংগ্রেস।
রাজনৈতিক চাপ বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কমেনি। আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার গ্রুপ ও একটি উভচর আক্রমণকারী যুদ্ধজাহাজ অবস্থান করছে। এ ছাড়া তৃতীয় আরেকটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ওই অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নিজেদের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানি জাতি রণক্ষেত্র ও হরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পকে কৌশলগতভাবে পরাজিত করেছে। এবার ওয়াশিংটনেও তাঁর রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছে।
তবে নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেও সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘সেই যুদ্ধের জায়গায় দাঁড়িয়ে বলতে পারি, আমি যা করেছি তার থেকে আলাদা কিছুই করতাম না।’
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখন ট্রাম্প ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীনতা পেতে পারেন।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক অ্যালান আইয়ারের মতে, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আগামী জানুয়ারির আগে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব গ্রহণ করছে না। দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রেসিডেন্টের সামরিক সিদ্ধান্ত কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা, কংগ্রেসের সম্ভাব্য বাধা এবং ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করবেন ট্রাম্প, নাকি কংগ্রেসের চাপের মুখে যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসবেন, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত