
ডেস্ক রিপোর্ট | শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৪৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে যানবাহনের নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষায় কঠোরতা আরোপ করছে প্রশাসন। বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, সিসিটিভি ক্যামেরায় নজরদারি, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং চালকদের প্রশিক্ষণের ওপরও দেওয়া হচ্ছে বিশেষ গুরুত্ব। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ঘটনা কমাতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ ও চালক-পথচারীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক তদন্ত, মামলা দায়ের এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ট্রাফিক বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সমন্বিত উদ্যোগে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে। যানবাহনের নিবন্ধন, লাইসেন্স প্রদান ও ফিটনেস পরীক্ষায় দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইন প্রয়োগেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
বেপরোয়া গতি ও চালকদের অসতর্কতা বড় কারণ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত স্পিড ক্যামেরা ও স্পিড ব্রেকার স্থাপন, নিয়মিত নজরদারি এবং অদক্ষ চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, চালকদের অসতর্কতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অতিরিক্ত গতি, গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোনে কথা বলা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, পথচারীদের অসচেতনতা ও অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনা রোধে আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা, ফুটপাত ও সড়কের মান উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সড়কবাতি, ট্রাফিক সিগন্যাল, জেব্রা ক্রসিং ও সড়কচিহ্ন স্থাপনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
একই সঙ্গে হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং মাদকাসক্ত বা ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন ড. শামসুল হক।
ছোট যানবাহনের চলাচলেও বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি
সড়কের বিশৃঙ্খলাকে দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ উল্লেখ করে ড. শামসুল হক বলেন, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, টেম্পো ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো ছোট যানবাহনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব যান দ্রুতগতির যানবাহনের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এসব যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, প্রধান সড়কের পাশে ফুটপাত দখল ও মার্কেট গড়ে ওঠায় পথচারীদের চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি চালকদের পেশাদার প্রশিক্ষণের অভাবও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান বা ‘ব্ল্যাক স্পট’ চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালানোর তাগিদ দেন এই প্রকৌশলী।
মহাসড়কে ছোট যান নিয়ন্ত্রণের তাগিদ
লালবাগ ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. মোফিজুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে কিছু চালক ট্রাফিক আইন অমান্য করে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান। তাই চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে ছোট যানবাহনের চলাচল কমানো না গেলে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
ছয় মাসে ৪ হাজার ২৩৩ দুর্ঘটনা, নিহত ৫ হাজার ২৪৬
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা শুধু প্রাণহানির কারণ নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। দুর্ঘটনায় কেউ নিহত বা পঙ্গু হলে পরিবারের আয় কমে যায়। অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে।
মোটরসাইকেল আরোহী, সাধারণ পথচারী, শিশু, সাইকেল ও তিন চাকার যানবাহনের যাত্রী এবং সড়কের পাশে বসবাসকারী মানুষ দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং ও উল্টো পথে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল এবং যানবাহন পরিদর্শনে দুর্বলতাও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলেও যাতে প্রাণহানি না ঘটে, এমন নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, মিডিয়ান ব্যারিয়ার, উপযুক্ত বাসস্টপ, পর্যাপ্ত আলো, স্পষ্ট রোড মার্কিং এবং স্কুল ও বাজার এলাকায় নির্দিষ্ট গতিসীমা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ছয় মাসে সারা দেশে ৪ হাজার ২৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪৬ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৫৪৪ জন আহত হয়েছেন।
চালক-পথচারী উভয়ের সচেতনতায় কমবে দুর্ঘটনা
সড়কে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে পথচারী মো. সাফিউর রহমান বলেন, যত্রতত্র রাস্তা পার না হয়ে পথচারীদের সচেতনভাবে চলাচল করা উচিত। দ্রুত রাস্তা পার হওয়ার প্রবণতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে অনেক চালক অস্বাভাবিক বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ট্রাফিক আইন না মেনে গাড়ি চালান।
চালক ও পথচারী—উভয়ের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমেই সড়ক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত