
ডেস্ক রিপোর্ট | শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৮০ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, ইরান সংঘাতে বিপুল অস্ত্র ব্যবহারের কারণে ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর প্যাট্রিয়ট প্যাক-৩ ইন্টারসেপ্টর ও আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস)-এর মজুতও সংকটজনক পর্যায়ে নেমে গেছে।
ইউরোপের প্রতিরক্ষায় চাপ
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যাপকভাবে বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে ইউরোপে মোতায়েন মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইউরোপে থাকা প্যাক-৩ প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ও এটিএসিএমএস-এর মজুত এমন পর্যায়ে নেমেছে, যা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের কাছে ‘বিয়ন্ড ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অর্থাৎ বড় ধরনের সংঘাত শুরু হলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া জানানোর মতো পর্যাপ্ত মজুত নাও থাকতে পারে।
সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও ইউরোপে মার্কিন প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতিকে ‘বিয়ন্ড ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে উল্লেখ করে। এতে রাশিয়ার সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষেত্রে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে পেন্টাগন ও ন্যাটো এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নয়। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে প্রকাশিত কিছু দাবি ‘ভুল’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
চীন-রাশিয়ার সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে শঙ্কা
মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের বড় উদ্বেগ হলো, ইরান সংঘাতে ব্যবহৃত অস্ত্রের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা না গেলে একই সময়ে অন্য কোনো বড় শক্তির সঙ্গে সংঘাত তৈরি হলে ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।
বিশেষ করে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর সরাসরি সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের প্রয়োজন হতে পারে।
অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধক্ষমতা বা ‘ডিটারেন্স’ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এর প্রভাব পড়তে পারে ইউক্রেনেও। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র চেয়ে আসছে। কিন্তু নিজস্ব মজুত পুনর্গঠন না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনসহ মিত্রদের অতিরিক্ত অস্ত্র সরবরাহ করা ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন হতে পারে।
মজুত পুনর্গঠনে লাগতে পারে কয়েক বছর
ইরান সংঘাতে ব্যবহৃত অস্ত্র দ্রুত প্রতিস্থাপন করাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিত্রদেশ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও জার্মানি থেকে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে মজুত পুনর্গঠন করা হলেও এতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে উৎপাদন বাড়ালেও তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব নয়।
এপি’র প্রতিবেদনে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) হিসাব তুলে ধরে বলা হয়েছে, ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি ইন্টারসেপ্টরের মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০টি ব্যবহৃত হয়েছে বলে ওই হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর প্রায় ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা রাখলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ন্যাটোর তথ্য অনুযায়ী, জার্মানিতে ইউরোপের প্রথম প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রও চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
সরাসরি হামলা কমলেও কাটেনি সংকট
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সরাসরি হামলার মাত্রা কমেছে। তবে সংঘাতের সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহারের কারণে তৈরি হওয়া ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ফলে একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বজায় রাখা এবং অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ধরে রাখার মধ্যে ভারসাম্য করতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অস্ত্রের মজুত দ্রুত পুনর্গঠন করা না গেলে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় একই সময়ে সংকট তৈরি হলে বর্তমান অস্ত্রঘাটতি বড় কৌশলগত দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
তবে পেন্টাগনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। দেশটির হাতে এখনও প্রয়োজনীয় সামরিক সক্ষমতা রয়েছে এবং অস্ত্র উৎপাদন ও মজুত পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে চলছে।
তবু ইরান সংঘাতে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর যে বড় চাপ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি মিত্রদেশগুলোর মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। ফলে সংঘাতের সামরিক ফলাফলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিরোধ কৌশল নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত