
ডেস্ক রিপোর্ট | বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৯ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) জয় পেয়েছেন মিশরীয়-আমেরিকান সার্জন আদম হামাওয়ি। নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। নিউ জার্সির প্রতিনিধিত্বকারী প্রথম মুসলিম ও প্রথম মিশরীয়-আমেরিকান হিসেবে মার্কিন কংগ্রেসে জায়গা করে নিয়েছেন এই চিকিৎসক।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির বড় জয়ের ধারায় যুক্ত হন হামাওয়ি। বিজয়ী ভাষণে গাজার মানুষের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গাজা ও ফিলিস্তিনের পুরুষ, নারী ও শিশুদের বলছি, তোমাদের মুখের হাসি আমাকে একটি সুন্দর বিশ্ব গড়ার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সাহস ও আশা জোগায়।’
এমএস নাউয়ের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে আগে রিপাবলিকানদের ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি আসন ছিল। তবে জানুয়ারিতে আদম হামাওয়িসহ নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাটরা শপথ নিলে ২৫০টি আসন নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে যাচ্ছে ডেমোক্রেটিক পার্টি।
নিউ জার্সির প্রিন্সটনে নির্বাচনী ফল পর্যবেক্ষণ অনুষ্ঠানে বিজয়ী ভাষণে হামাওয়ি দ্রুত কাজে নামার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জবাবদিহির আওতায় আনব।’
নিজের পেশার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আমি একজন সার্জন। আপনাদের বলতে পারি, আমরা এই রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে যাচ্ছি। ওয়াশিংটনের এস্টাবলিশমেন্ট দীর্ঘদিন ধরে যেসব আমেরিকানকে পেছনে ফেলে রেখেছে, তাদের প্রত্যেকের অধিকারের জন্য আমরা লড়ব।’
হামাওয়ির বিজয় উদযাপনে দেখা যায় ব্যতিক্রমী সংহতির চিত্র। কংগ্রেসওম্যান বনি ওয়াটসন কোলম্যান তাঁকে কোলাকুলি করে মঞ্চে নিয়ে যান। এ সময় ‘জিউস ফর হামাওয়ি’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে ‘জিউইশ ভয়েস ফর পিস’-এর সদস্যরাও তাঁর প্রতি সমর্থন জানান।
তবে প্রচারণাকালে মুসলিমবিদ্বেষের তীব্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে হামাওয়িকে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর জীবনে মুসলিমবিদ্বেষকে এতটা প্রকাশ্যে, উচ্চকিত ও গ্রহণযোগ্য হতে দেখেননি। তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও বন্ধুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এমনকি তাঁর আনুগত্য ও দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
হামাওয়ির জয়ের পেছনে তাঁর ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সমর্থকেরা। নির্বাচনী আয়োজনে কেফিয়াহ পরা ও হাতে মার্কিন পতাকা নিয়ে বহু সমর্থক অংশ নেন।
নিউ জার্সির ভোটার ইয়োশি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, হামাওয়ির ফিলিস্তিনবিষয়ক স্পষ্ট অবস্থান তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ‘বোমা নয়, স্বাস্থ্যসেবা’—এই বার্তাই তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।
প্রচারণায় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা ইয়োশি বলেন, এই জয় সাধারণ মানুষের তৃণমূল আন্দোলনের বিজয়। তাঁর মতে, সংগঠিত সাধারণ মানুষ সংগঠিত অর্থকেও পরাজিত করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, হামাওয়ির জয় কেবল শুরু। কারণ গাজা এখনো অবরুদ্ধ এবং সেখানে বোমা হামলা চলছে। যুদ্ধ ও গণহত্যার পেছনে করের অর্থ ব্যয় বন্ধের দাবি জানান তিনি।
ফিলিস্তিনপন্থি ও প্রগতিশীল অবস্থানের কারণে প্রচারণাকালে প্রো-ইসরায়েলি ও চরম ডানপন্থি গোষ্ঠীর তীব্র আক্রমণের মুখে পড়েন হামাওয়ি। তবে এসব সমালোচনায় দমে যাননি তিনি। প্রাইমারির আগে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হামাওয়ি বলেছিলেন, রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে জীবনে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে হামাওয়ির আদর্শের সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত মুসলিম ধর্মপ্রচারক ওমর আবদেল রহমানের মতাদর্শের যোগসূত্র খোঁজার চেষ্টা করা হয়। ‘ব্লাইন্ড শেখ’ নামে পরিচিত আবদেল রহমান ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে তৎকালীন মিশরীয় প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ২০১৭ সালে কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।
ওই মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রায় ২০০ জন সাক্ষীর মধ্যে আদম হামাওয়িও ছিলেন। আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি জানিয়েছিলেন, আবদেল রহমান আমেরিকাবিরোধী মনোভাব প্রকাশ করলেও হত্যাকাণ্ড কীভাবে সংঘটিত করতে হবে, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেননি।
সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে হামাওয়ির এই বিজয় সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নিউজার্সি এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ন্যান্সি সেডলাক বলেন, এই ফলাফল গত কয়েক বছরের নোংরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মার্কিন রাজনীতির প্রতি তাঁর বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছে। প্রকাশ্য শিক্ষার প্রতি হামাওয়ির সমর্থন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার তাঁকে ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে।
একজন মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও অভিজ্ঞ সার্জন হিসেবে হামাওয়ির নির্বাচনী অঙ্গীকারের কেন্দ্রে ছিল অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও কর্মজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়ন। ‘বোমা নয়, স্বাস্থ্যসেবা’ স্লোগান সামনে রেখে তিনি সবার জন্য সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা (মেডিকেয়ার ফর অল), সাশ্রয়ী আবাসন ও শিক্ষা, অভিবাসী ও নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা এবং মানবাধিকারভিত্তিক মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রতিশ্রুতি দেন।
মিশরীয় অভিবাসী মা-বাবার সন্তান আদম হামাওয়ির বেড়ে ওঠা নিউ জার্সিতে। দেশের সেবা ও নিজের শিক্ষার খরচ জোগাতে তিনি নিউ জার্সি আর্মি ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দেন। চিকিৎসাশাস্ত্রের শিক্ষার্থী থাকাকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বসনিয়ায় প্রথম মানবিক চিকিৎসা মিশনে অংশ নেন।
২০০১ সালে নিউইয়র্কে ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর গ্রাউন্ড জিরোতে উদ্ধারকাজে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেন তিনি। এর তিন বছর পর মার্কিন সেনাবাহিনীতে কমব্যাট ট্রমা সার্জন হিসেবে যোগ দেন।
২০০৪ সালে ইরাক যুদ্ধে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে গুরুতর আহত হওয়া ইলিনয়ের বর্তমান সিনেটর ট্যামি ডাকওয়ার্থের জীবন বাঁচিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন হামাওয়ি।
গত ৩০ বছর ধরে সুদান, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন, তুরস্ক ও জর্ডানসহ বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ ও দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবক চিকিৎসক হিসেবে সেবা দিয়ে আসছেন তিনি। বিশেষ করে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সেখানে সরাসরি উপস্থিত থেকে বিপর্যস্ত চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যেও ফিলিস্তিনিদের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই চিকিৎসক।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত