
ডেস্ক রিপোর্ট | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ২ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে জাপানের সাংবাদিক ইউকি ইমাইকে গ্রেফতার করেছে রাশিয়া। দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসংক্রান্ত তথ্য জাপানের জন্য সংগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত বিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইউকি ইমাই জাপানের সংবাদমাধ্যম হোক্কাইডো শিমবুনে কর্মরত। রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের সাখালিন অঞ্চলে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। রাশিয়া ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগে তাঁকে আটক করা হয়। পরে বিমানে করে মস্কো নেওয়ার পর আদালত তাঁকে বিচার-পূর্ব আটক রাখার নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছে রুশ সংবাদমাধ্যম।
জাপান সরকার জানিয়েছে, ইমাইয়ের গ্রেফতারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি টোকিও।
রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপানের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নির্দেশে ইমাই কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। কুরিল দ্বীপপুঞ্জে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা তিন ব্যক্তিকে হোটেলের একটি কক্ষে ঢুকে একজনকে হাতকড়া পরাতে দেখা যায়। পরে তাঁকে বিমানে তোলা এবং মস্কোর একটি আদালতে খাঁচার মতো ঘেরাটোপের মধ্যে দাঁড় করানোর দৃশ্যও রয়েছে। তবে ভিডিওতে আটকের তারিখ বা আদালতে শুনানির সময় জানানো হয়নি।
রুশ সংবাদ সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স জানিয়েছে, ইমাইকে আগামী ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিচার-পূর্ব আটক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে রাশিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, বিদেশি সাংবাদিকদের ব্যবহার করে রাশিয়ার নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহের টোকিওর প্রচেষ্টা দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, এমন অন্য কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের নাম উল্লেখ করেননি জাখারোভা।
জাপানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইমাইকে গ্রেফতারের ঘোষণা দেওয়ার আগে তাঁর সরকার এ বিষয়ে কিছু জানত না। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।
ইমাইয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক এবং সাখালিন অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর সংবাদমাধ্যম হোক্কাইডো শিমবুন গ্রেফতারের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করেনি। বিবিসির প্রশ্নের জবাবে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, তারা ঘটনার বিস্তারিত যাচাই করছে এবং সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে কয়েক দশক ধরে বিরোধ চলছে। জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় হোক্কাইডো ও রাশিয়ার কামচাটকা উপদ্বীপের মধ্যবর্তী এই দ্বীপপুঞ্জ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে এর দক্ষিণের চারটি দ্বীপের মালিকানা দাবি করে জাপান। টোকিও এসব দ্বীপকে ‘নর্দার্ন টেরিটরিজ’ বলে অভিহিত করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে শান্তিচুক্তি না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এই বিরোধ।
গত আগস্টে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিতর্কিত দ্বীপগুলো সফর করলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানা তাকাইচি সফরটির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, এটি জাপানের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং নর্দার্ন টেরিটরিজ নিয়ে টোকিওর ধারাবাহিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মস্কো তাঁর বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিকভাবে অনুপযুক্ত’ ও ‘আইনগতভাবে ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাপান। এতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শীতল হয়ে পড়ে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জাপানি প্রেসিডেন্ট তোমোকো আকানেকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েও টোকিওর অসন্তোষ বাড়িয়েছে মস্কো। ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর ২০২৩ সাল থেকে আকানে ও আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তা রাশিয়ার ওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন।
আগেও বিদেশি সাংবাদিক আটক করেছে রাশিয়া
রাশিয়ায় বিদেশি সাংবাদিক আটকের ঘটনা নতুন নয়। ২০২৩ সালে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সাংবাদিক ইভান গারশকোভিচকে আটক করে রাশিয়া। পরে তাঁকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বৃহত্তম বন্দিবিনিময়ের অংশ হিসেবে তিনি মুক্তি পান।
এ ছাড়া ২০১৯ সালে রাশিয়ার ভ্লাদিভস্তকে সামরিক গোপন তথ্য সংগ্রহের সন্দেহে জাপানের কিয়োদো নিউজের এক সাংবাদিককে আটক করা হয়েছিল। পরে তাঁকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ইউকি ইমাইয়ের গ্রেফতারের ঘটনা জাপান ও রাশিয়ার মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
সূত্র: বিবিসি

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত