
ডেস্ক রিপোর্ট | বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬ | প্রিন্ট | ৩১ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

ছবি: আল-জাজিরা থেকে সংগৃহীত
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ব্যবহারের জন্য বুলগেরিয়ার বেজমের বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েনের খবরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আতঙ্কে ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা ছিল, মার্কিন সামরিক স্থাপনা ব্যবহারের কারণে ছোট্ট গ্রামটি ইরানের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
তবে শনিবার কিছুটা স্বস্তির খবর পান গ্রামবাসীরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর দুটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ বেজমের বিমানঘাঁটি ছেড়ে যায়।
বুলগেরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিতার স্তোয়ানোভ জানান, মার্কিন বিমানগুলো দেশ ছেড়ে গেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইলিয়ানা ইয়োতোভাও বলেন, আপাতত মিশন শেষ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অভিযানে সহায়তার জন্য মোতায়েন করা উড়োজাহাজগুলো অন্য ‘অপারেশনাল প্রয়োজন’ মেটাতে বুলগেরিয়া ছেড়েছে।
তবে বিমান চলে গেলেও বেজমের বাসিন্দাদের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব আবারও তাদের এলাকায় পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা এখনও রয়েছে।
ইরানের হুঁশিয়ারিতে বাড়ে আতঙ্ক
ইরানের পক্ষ থেকে আগেই বুলগেরিয়াকে সতর্ক করা হয়েছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে বুলগেরিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল তেহরান।
এরপর ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান বাড়ালে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার সম্ভাবনা বিবেচনা করেছিল ইরান। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় বেজমের বিমানঘাঁটির নামও ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এতে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। এক স্থানীয় নারী বলেন, ‘আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি, আমাদের গ্রামে যেন হামলা না হয়। আমরা ভীত, কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের কিছুই করার নেই।’
মাত্র এক হাজার মানুষের গ্রাম
বেজমের প্রায় এক হাজার মানুষের ছোট্ট একটি গ্রাম। বিমানঘাঁটির পাশেই এর অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে বুলগেরিয়ার সামরিক উড়োজাহাজ গ্রামের আকাশে ওড়াউড়ি করায় সামরিক বিমানের শব্দ স্থানীয়দের কাছে পরিচিত।
তবে গত জুলাইয়ের শেষ দিকে পরিস্থিতি বদলে যায়। বুলগেরিয়া সরকার সর্বোচ্চ আটটি মার্কিন কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাংকার এবং ২৫০ জন পর্যন্ত মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা মোতায়েনের প্রস্তাব দেয়। পরে দেশটির পার্লামেন্টও তা অনুমোদন করে।
এরপর মাত্র দুই দিনের মধ্যে বেজমের ও আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা মোতায়েনের প্রতিবাদে তিন হাজারের বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি ছিল, গ্রামকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে কোনোভাবেই জড়িয়ে ফেলা যাবে না।
বিমান চলে যাওয়ায় স্বস্তি
মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো বেজমের ছেড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রামজুড়ে স্বস্তি ফিরে আসে।
মেয়র রোজেন রুসেভ বলেন, স্থানীয়দের মনে হচ্ছে, অবশেষে তাদের কণ্ঠস্বর শোনা হয়েছে।
এর আগে সরকারও বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মার্কিন উড়োজাহাজ বা বুলগেরিয়ায় থাকা অন্যান্য স্থাপনার বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট হুমকি শনাক্ত করেনি। যুক্তরাজ্যের একটি মূল্যায়নেও হামলার ঝুঁকি ‘অত্যন্ত কম’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবুও আশঙ্কা কাটেনি সবার।
‘আমরাই প্রথম লক্ষ্যবস্তু’
৬৭ বছর বয়সী দিনকা তোদোরোভা ও ৭৮ বছর বয়সী গানকা ভ্লায়েভার সন্তানরা বেজমের বিমানঘাঁটিতে কাজ করেন। তাদের চোখে যুদ্ধের আশঙ্কা আরও বাস্তব।
ভ্লায়েভা বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন কাঁপতে থাকি এবং প্রার্থনা করি, যুদ্ধ যেন এখানে না আসে। আমরাই প্রথম লক্ষ্যবস্তু। অনেক মানুষ মারা যাবে।’
তোদোরোভা যোগ করেন, ‘শিশুরাও। লোভীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য।’
তবে গ্রামের সবাই যে ইরানের হামলার আশঙ্কায় আতঙ্কিত, তা নয়। ৩৩ বছর বয়সী এক বাসিন্দার মতে, পরিস্থিতি নিয়ে ‘ভিত্তিহীন আতঙ্ক’ ছড়ানো হচ্ছে। তার উদ্বেগ বরং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা কৃষ্ণসাগরের দিক থেকে রাশিয়ার সম্ভাব্য কোনো হুমকি নিয়ে।
শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে আয়োজন
মার্কিন বিমান মোতায়েনের প্রতিবাদের মধ্যেও শিশুদের স্বাভাবিক পরিবেশে রাখার চেষ্টা করেছেন স্থানীয়রা। বিমানঘাঁটিতে কর্মরত এক সেনাসদস্যের মেয়ে আন্তোনিয়া ইভানোভা শিশুদের জন্য অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, পরিস্থিতির কারণে শিশুদের মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ কিছুটা কমানো।
তিনি বলেন, ‘এই পুরো পরিস্থিতিতে আমরাই সবচেয়ে নির্দোষ। আমরা আমাদের বাড়ির কাছে ওই বিমানগুলো চাইনি।’
তথ্যের ঘাটতিতে বাড়ছে উদ্বেগ
মেয়র রোজেন রুসেভ বলেন, স্থানীয়দের প্রতিবাদ সরকারের পতন ঘটানোর কোনো প্রচেষ্টা ছিল না। তারা শুধু সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘বিমানগুলো এখানে থাকলে সম্ভাব্য হুমকি কী হতে পারে এবং আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কী—আমরা শুধু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য চেয়েছিলাম।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলে জানান তিনি। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে নানা অনুমাননির্ভর তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
হামলার ঝুঁকি কতটা?
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বুলগেরিয়া ইরানের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় থাকলেও ইউরোপের মূল ভূখণ্ডে সফল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর মতো সক্ষমতা তেহরানের নাও থাকতে পারে। একই সঙ্গে এমন হামলা চালানোর বাস্তব ইচ্ছাও ইরানের নেই বলে তাদের ধারণা।
বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী রুমেন রাদেভ বলেন, বেজমের থেকে মার্কিন জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানগুলো ‘দক্ষিণ দিকে’ একটিও উড্ডয়ন করেনি। এগুলো ন্যাটোর অন্য সদস্যদেশে প্রশিক্ষণ ও মহড়ায় অংশ নিতে গেছে।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সামরিক আগ্রাসনকে সমর্থনকারী’ যেকোনো পদক্ষেপের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তেহরান সংরক্ষণ করে।
মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘বুলগেরিয়ার জনগণের সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।’
মার্কিন উড়োজাহাজগুলো আপাতত বেজমের ছেড়ে গেলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের ভূরাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে গ্রামটিতে উদ্বেগ এখনও রয়ে গেছে। যুদ্ধের সরাসরি অংশ না হয়েও মিত্র দেশের সামরিক তৎপরতার কারণে সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন বেজমের অনেক বাসিন্দা।
সূত্র: আল-জাজিরা

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত