
সফিউর রহমান সফিক | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | প্রিন্ট | ৫৫ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন কি সরকারি চাকুরির বিধিমালা লংঘন করে বিশেষ কারিশমায় তিনি এলেন আবারো ঢাকা এল এ শাখায়। ঢাকায় এল এ শাখায় যোগদান করেই সিন্ডিকেট করে চলছে তার পুরানো আমলের কারবার। এদিকে
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখা-৩ এর কানুনগো মোহাম্মদ চুন্নু মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড় গড়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। সরকারি চাকুরির বিধিমালা এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে একই স্টেশনে বহাল থাকা এবং ক্ষতিপূরণের টাকা ছাড় করাতে ৫% থেকে ২০% পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ঘুষ বা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে । তার এমন অবৈধ কর্মকাণ্ডের কারণে ভুক্তভোগী মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাই এই বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও ভূমি সংস্কার বোর্ড এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিভিন্ন মহল ।
প্রজ্ঞাপন ও বিধিমালাকে বুড়ো আঙুল
ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি সংস্কার বোর্ডের প্রচলিত নিয়ম ও প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মাঠ প্রশাসনে কোনো কর্মচারী যে স্টেশনে ‘সার্ভেয়ার’ হিসেবে কর্মরত থাকবেন, পদোন্নতি পেয়ে ‘কানুনগো’ হওয়ার পর কোনোভাবেই আর পূর্বের ঔ একই স্টেশনে বা শাখায় যোগদান বা বদলি হতে পারবেন না। দীর্ঘদিন ঢাকা এলএ শাখায় সার্ভেয়ার হিসেবে সুনামের সাথে নয়, বরং বিতর্কিতভাবে কর্মরত ছিলেন চুন্নু মিয়া। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের বড় পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় তিনি কানুনগো (১০ম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পান। কানুনগো হিসাবে পদোন্নতির জন্য তিনি খরচ করেন কোটি টাকার উপরে অনুসন্ধানে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকুরির শৃঙ্খলা বিধিমালা ভঙ্গ করে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলে মোটা অংকের অর্থ ঢেলে তদবিরের মাধ্যমে তিনি আইনকে ফাঁকি দিয়ে পুনরায় পূর্বের লাভজনক কর্মস্থল অর্থাৎ ঢাকা এলএ শাখাতেই কানুনগো হিসেবে পদায়ন ও বদলির আদেশ বাগিয়ে নেন। যেখানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে চাকুরির ক্ষেত্রে অনৈতিক তদবির বা নিয়মবহির্ভূত পদায়ন শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সেখানে চুন্নু মিয়ার ক্ষেত্রে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে।
ফাইল প্রতি ৫% থেকে ২০% কমিশন বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত ভূমির প্রকৃত মালিকদের ক্ষতিপূরণ ও অবকাঠামোর টাকা ছাড় করানোর মূল চাবিকাঠি এখন কানুনগো চুন্নু মিয়ার হাতে। ভুক্তভোগী জমি মালিকদের অভিযোগ, এলএ শাখা-৩ এ ক্ষতিপূরণের ফাইলের প্রসেস ও চেকে স্বাক্ষর করানোর জন্য কানুনগো চুন্নু মিয়াকে ৫% থেকে ২০% পর্যন্ত সরাসরি ক্যাশ কমিশন দিতে হয়। ঘুষের টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়, বিভিন্ন ধরনের ভুয়া ত্রুটি কিংবা আইনি জটিলতার অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষদের হয়রানি করা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেখ মুজিবের মাজারে দল বেঁধে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর চুন্নু মিয়া
এখানেই শেষ নয় ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর চুন্নু মিয়া হাসিনা সরকারের আমলে বছরের পর আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে ঢাকা এল এ শাখায় কর্মরত ছিলেন । ঢাকা এল এ শাখায় থেকে ঘুষ দুর্নীতি নানান অনিয়ম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চুন্নু মিয়া ও তার সিন্ডিকেট । চুন্নু মিয়ার বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও কোন ব্যবস্থা দেয়নি ঐ সময়কালীন প্রশাসন। ৫ ই আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে চুন্নু মিয়াকে ঢাকা এল এ শাখা থেকে বদলি করা হয়। তবে এই বদলির কয়েক মাস যেতে না যেতে আবার চুন্নু মিয়া এলেন বিপুল অর্থ খরচ করে ঢাকা এল এ শাখায়। এসেই পূর্বের সিন্ডিকেট সচল করে বেপরোয়াভাবে চলছে তার ঘুষ দুর্নীতি নানান অনৈতিক কর্মকান্ড । এই ফ্যাসিস্টের দোসর চুন্নু মিয়া দল বেঁধে শেখ মুজিবের মাজারে টুঙ্গিপাড়ায় ফুল দিতে গিয়েছেন একাধিকবার ঘটা করে । এসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ছবিই প্রমাণ করে তার অতীত কর্মকাণ্ড কি ছিল।
অবৈধ সম্পদের পাহাড়
সাধারণ একজন সরকারি কর্মচারী হয়েও বিগত বছরগুলোতে ঢাকা এলএ শাখার বিপুল অর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন চুন্নু মিয়া। নামে-বেনামে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিকানা গড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা তার বৈধ আয়ের উৎসের সাথে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয়। এইসব সম্পদের বেশিরভাগই করেছেন স্ত্রী আত্মীয়-স্বজনের নামে বেনামী আইনের হাত থেকে রক্ষা পেতে ।
ভুক্তভোগীদের দাবি
ঢাকা এলএ শাখার এই ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ভূমি দানকারী সাধারণ নাগরিকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই বিতর্কিত কানুনগো চুন্নু মিয়ার অবৈধ বদলি বাতিলসহ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির মাধ্যমে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ঢাকা এল এ শাখার কানুনগো চুন্নু মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে তার মোবাইলে ফোন দিলে তিনি বলেন এই ব্যাপারে তিনি কোন কথা বলতে নারাজ। বিধি লঙ্ঘন করে বদলি নিয়োগের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি এর সঠিক উত্তর না দিয়ে উপরস্থ কর্মকর্তারা এই বিষয়ে জানেন বলে এ কথা বলে ফোন রেখে দেন ।

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত