
ডেস্ক রিপোর্ট | শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১০৭ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে

রোবট এখন শুধু মানুষের হয়ে কাজই করছে না, অন্য রোবট তৈরির কাজেও যুক্ত হচ্ছে। চীনের লিউঝৌ শহরে এমন একটি কারখানা চালু হয়েছে, যেখানে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির সহায়তায় তৈরি হচ্ছে হিউম্যানয়েড রোবট। নতুন এই কারখানায় প্রতি ১০ মিনিটে একটি করে শিল্পকারখানে ব্যবহারের উপযোগী হিউম্যানয়েড রোবট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।
চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক রোবোটিকস গুয়াংশি ঝুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের লিউঝৌ শহরে এ কারখানা চালু করেছে। ১৪ হাজার বর্গমিটার আয়তনের কারখানাটির উচ্চতা ১৩ দশমিক ৮ মিটার। এখানে মূলত ইউবিটেকের ‘ওয়াকার এস’ ও ‘ক্রুজর’ সিরিজের শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করা হয়। কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১০ হাজার রোবট।
রোবট তৈরিতেও রোবট
কারখানাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, রোবট তৈরির বিভিন্ন ধাপেই অন্য রোবট ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউবিটেক ও সিমেন্স ডিজিটাল ইন্ডাস্ট্রিজ সফটওয়্যারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি কারখানাটির উৎপাদনব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে ‘স্মার্ট ব্রেইন’ নামে একটি ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে।
কোম্পানির দাবি, এই ডিজিটাল ব্যবস্থা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ সমন্বয় করে। কোন রোবট কখন তৈরি হবে, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কোথায় সরানো হবে এবং তৈরি হওয়া রোবটের মান যাচাই—এসব কাজেও এটি সহায়তা করে।
উৎপাদনপ্রক্রিয়ার প্রতিটি রোবটকে আলাদা সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়। ফলে কারখানায় প্রবেশের পর থেকে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে রোবটটির গতিবিধি ও উৎপাদন-সংক্রান্ত তথ্য অনুসরণ করা সম্ভব হয়।
রোবটের কাজও করছে রোবট
কারখানায় রোবট শুধু চূড়ান্ত পণ্য হিসেবে তৈরি হচ্ছে না, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন কাজেও হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইউবিটেক জানিয়েছে, তাদের ‘ক্রুজর ওয়াই১’ ও ‘ক্রুজর এস২’ মডেলের রোবট বিভিন্ন উপকরণ খালাস, স্তূপ করে রাখা, উৎপাদন লাইনে পৌঁছে দেওয়া এবং কারখানার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চূড়ান্ত সংযোজন বা অ্যাসেম্বলির সময় ব্যবহার করা হচ্ছে সহযোগী রোবোটিক বাহু, চালকবিহীন লজিস্টিক যান, শক্তি-সহায়ক ম্যানিপুলেটর ও ঘূর্ণনশীল ওয়ার্কটেবল। এতে একই উৎপাদন লাইনে একাধিক ধরনের রোবট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতিটি মডেলের জন্য আলাদা অ্যাসেম্বলি লাইন বা সম্পূর্ণ পৃথক উৎপাদনব্যবস্থার প্রয়োজন হচ্ছে না।
কোম্পানির দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় মানুষের সরাসরি তদারকি খুবই কম। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার সমন্বয়ে কারখানাটি প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হতে পারে।
কারখানা ছাড়ার আগে চার ঘণ্টার পরীক্ষা
হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির পরই সেগুলো বাজারে পাঠানো হয় না। প্রতিটি রোবটকে চার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।
রোবটটির যান্ত্রিক ও কার্যকরী সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এর বাহ্যিক অবস্থাও পরীক্ষা করা হয়। এ জন্য প্রতিটি রোবটের ৩৬০ ডিগ্রি ভিজ্যুয়াল পরিদর্শন করা হয়, যাতে সব দিক থেকে এর গঠন ও বাহ্যিক মান যাচাই করা যায়।
৬৫ বর্গমিটারে ১১২ রোবট
উৎপাদনের পর রোবট সংরক্ষণেও ব্যবহার করা হয়েছে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি। ইউবিটেকের দাবি, তাদের স্বয়ংক্রিয় গুদামে মাত্র ৬৫ বর্গমিটার জায়গার মধ্যে ১১২টি হিউম্যানয়েড রোবট রাখা যায়।
স্বয়ংক্রিয় গাইডেড ভেহিকল (এজিভি), চালকবিহীন ফর্কলিফট ও অন্যান্য লজিস্টিক যন্ত্র রোবট ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশকে উৎপাদন, পরীক্ষণ এবং সংরক্ষণ এলাকার মধ্যে স্থানান্তর করে।
ফলে রোবট তৈরির পর সেগুলো গুদামে নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী সরানো এবং উৎপাদন লাইনে যন্ত্রাংশ পৌঁছে দেওয়ার কাজও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
দ্রুত বাড়ছে চীনের রোবট উৎপাদন
ইউবিটেকের নতুন কারখানাটি এমন সময়ে চালু হলো, যখন চীনে শিল্পক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার ও উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে। দেশটি গবেষণাগার ও পরীক্ষামূলক প্রকল্প থেকে রোবট প্রযুক্তিকে বাস্তব শিল্প উৎপাদনের কাজে নিয়ে যাওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর (এনবিএস) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে দেশটিতে ৯৮ হাজার ৬৭৭টি শিল্প রোবট উৎপাদিত হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৩০ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে চীনে শিল্প রোবট উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩৫ হাজার ৫৬টি, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।
লিউঝৌয়ের নতুন কারখানায় উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোবট, স্বয়ংক্রিয় যান, রোবোটিক বাহু ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজিটাল ব্যবস্থাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে রোবটের হাতে রোবট তৈরির ব্যবস্থা এখন বাস্তব শিল্প উৎপাদনের অংশ হয়ে উঠছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

© ২০২৬ দৈনিক নিউজ অব বাংলাদেশ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত